হিন্দুধর্মের স্বরূপ সন্ধান: উপসংহার (২য় অংশ)

এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য হিন্দুধর্মের দার্শনিক তত্ত্ব অনুসন্ধান; সামাজিক বা রাজনৈতিক হিন্দুধর্ম নিয়ে বিশদ আলোচনা এই প্রবন্ধের আওতার বাইরে। তবে উপসংহারে হিন্দুধর্মের এই দুই দিক সম্পর্কে কিছু কথার বলার প্রয়োজন রয়েছে। রাজনৈতিক হিন্দত্বের সাথে যেমনি দার্শনিক হিন্দুধর্মের সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই, তেমনি সামাজিক হিন্দুধর্ম থেকে দার্শনিক হিন্দধর্মকে পৃথকভাবে বিবেচনা করাও অসম্ভব নয়। মূলত বর্তমান পরিস্থিতিতে দার্শনিক হিন্দুধর্ম হতে রাজনৈতিক বা সামাজিক হিন্দুধর্মকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা করা দার্শনিক হিন্দুধর্মের সুস্বাস্থ্যের জন্যই আশু প্রয়োজন।

হিন্দুত্ব আগাগোড়াই একটি রাজনৈতিক দর্শন, যার মূল ভিত্তি এর প্রতিষ্ঠাতা ভীর সাভারকারের লেখার মধ্যেই পাওয়া যায়। সাভারকারের মতে, ভারতীয় উপমহাদেশ হতে উদ্ভূত যেকোন দর্শন বা চিন্তাকেই ‘হিন্দু’ শব্দ দ্বারা আখ্যায়িত করা যেতে পারে। এভাবে দেখলে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ এসকল ধর্ম ও দর্শন, এবং ভারতীয় জ্যোতিষ, চিকিৎসাশাস্ত্র, সামাজিক বিধিবিধান- এসবই ‘হিন্দু’। এই যুক্তিতে স্বাভাবিকভাবেই বিদেশী যেকোন দর্শন বা মত যেমন ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম, এমনকি আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শন বা চিন্তা এসবই ‘অহিন্দু’। সাভারকারের উপসংহার, ভারতের জাতি গঠনের প্রচেষ্টায় সকল অহিন্দু উপাদানকে বর্জন ও সকল হিন্দু উপাদানকে গ্রহণ করাই সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত। স্পষ্টতই, সাভারকারের এই হিন্দুত্ব তীব্র জাতীয়তাবাদী ও রক্ষণশীল একটি রাজনৈতিক মতবাদ, যাকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদেরই নামান্তর বলা যুক্তিযুক্ত। এমনকি এই মতবাদ ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে ‘অহিন্দু’ অনেক মতবাদ, যেমন ইসলাম অথবা পাশ্চাত্য আধুনিকতা, এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে পুরোপুরি অস্বীকার করে এগোয়। এক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয়, হিন্দু ধর্মের মূলগত দর্শনের সাথে হিন্দুত্বের কোন সরাসরি সম্পর্ক নেই। হিন্দু ধর্ম বড়জোর একটি ধর্মীয় দর্শন, অন্য দিকে হিন্দুত্ব একটি পরিষ্কার রাজনৈতিক মতবাদ। এছাড়া, হিন্দুত্বের তীব্র রক্ষণশীলতা হিন্দু ধর্মের বহুদিকমুখিনতার দর্শনের সাথেও সরাসরি সাংঘর্ষিক। গীতার মূল দর্শন দিয়ে এমনকি ইসলাম বা অন্য আব্রাহামীয় ধর্মের তত্ত্বকেও অনুমোদন করা যায়; উদাহরণস্বরূপ, ঊনিশ শতকের একজন গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু সাধক রামকৃষ্ণ পরমহংস এমনকি ইসলামী বিধান মেনেও পরমেশ্বরকে জানার চেষ্টা করেছিলেন। আবার পীর বা সুফি সাধকদের দরগায় অনেক ধর্মপ্রাণ হিন্দুরই দেখা মেলে। অথচ হিন্দুত্বের দর্শন অনুযায়ী যেকোন বিদেশী মতবাদই অহিন্দু এবং এ কারণে অনুমোদন-অযোগ্য।

অন্যদিকে ধর্মীয় বা দার্শনিক হিন্দুধর্ম যতোটা উদার, সামাজিক হিন্দুধর্ম ঠিক ততোটাই রক্ষণশীল। পূর্বেই এই প্রবন্ধে মন্তব্য করা হয়েছে যে, ঐতিহাসিক বিবেচনায় শ্রমবণ্টনের উদ্দেশ্যে হয়তো জাতপ্রথার একদা প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু যতোই সময় গড়িয়েছে, ততোই জাতপ্রথা একটি চরম বর্ণবাদী প্রথায় পরিণত হয়েছে। এটাই স্বাভাবিক, কারণ যখন বংশপরম্পরায় মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হতে শুরু করে, তখন সেই সমাজ ধীরে ধীরে একটি শোষণমূলক অভিজাততন্ত্রে পরিণত হয়, যেখানে অভিজাতদের বাইরে অন্য সকল শ্রেণীর মানুষের সুযোগ-সুবিধাকে তীব্রভাবে সংকুচিত করা হতে থাকে। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, হিন্দু সমাজ কি হিন্দু ধর্মের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িত নয়? এই প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয়, যদিও নিঃসন্দেহে অনেক হিন্দু সামাজিক বিধান হিন্দু শাস্ত্র থেকেই সরাসরি উৎসারিত হয়েছে, তথাপি হিন্দু সমাজের সমস্ত বিধিবিধানকে এই মুহূর্তে বাতিল করে দিলেও হিন্দুধর্মের মৌলিক তাত্ত্বিক ভিত্তির কোনরূপ হানি হয় না। হিন্দু সমাজের বাইরেও হিন্দু ধর্মের তাত্ত্বিক ভিত্তির অস্তিত্ব থাকে। পড়ন্তু হিন্দু সমাজের এতো বিধিবিধানের মধ্যে পড়ে হিন্দুধর্ম তার দার্শনিক ভিত্তিই অনেকটুকু হারিয়ে ফেলেছে- একেই বরং সত্যের অনেক বেশি কাছাকাছি মনে হয়। জাতপ্রথার দোহাই তুলে নীচু জাতের মানুষের বিকশিত হতে পারার সকল সুযোগ কেড়ে নেওয়ার মধ্যে আর যাই হোক সবাইকে ব্রহ্মজ্ঞানে বিবেচনা করার দর্শনকে খুজেঁ পাওয়া যায় না। তাছাড়া, বংশপরম্পরায় জাত নির্ধারণ করাও হিন্দুধর্মের মূল দর্শনের সাথে এক অর্থে সাংঘর্ষিক। ব্রাহ্মণের ঘরে জন্ম নিলেই কেউ আপনা আপনি ব্রাহ্মণ হয়ে যেতে পারে না। শুধুমাত্র জ্ঞানের প্রতি যার নিমোর্হ আকর্ষণ আছে, তাকেই ব্রাহ্মণ বলা মূলগতভাবে অধিকতর যৌক্তিক। এই যুক্তিতে ব্রাহ্মণত্ব বংশের উপর নির্ভর করে না, বরং এটা নির্ভর করে নির্দিষ্ট ব্যক্তির উপর।
বর্তমান আধুনিক সমাজব্যবস্থায় হিন্দুধর্মের কোন প্রাসঙ্গিকতা আদৌ আছে কি না এবার সংক্ষেপে এ প্রশ্নের মোকবিলা করা যাক। আমি মনে করি মানুষের সামগ্রিক ও যৌথ পরম্পরাগত যেকোন জ্ঞান বা অভিজ্ঞতাই মানুষের সভ্যতা বা সমাজের জন্য প্রাসঙ্গিক। এ বিবেচনায়, পৃথিবীর যেকোন ধর্ম বা দর্শন মত থেকেই আমাদের গ্রহণযোগ্য অনেক উপাদান আছে। কিন্তু একই সাথে সব ধর্ম বা দর্শনেরই সবটুকুই গ্রহণীয় নয়। সময়ের সাথে যেহেতু আমাদের নীতি-নৈতিকতার কাঠামো পরিবর্তিত হয়, সেহেতু বর্তমান সময়ের নীতি-নৈতিকতা ও সমাজব্যবস্থার সাথে কোন নির্দিষ্ট ধর্ম বা দর্শন মতের ঠিক কতোটুকু সঙ্গতিপূর্ণ তার নির্মোহ বিশ্লেষণ করা জরুরী। হিন্দুধর্মের মূলতত্ত্ব থেকে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত আমরা সহজেই গ্রহণ করতে পারি:

প্রথমত, সকল পথের অনুমোদন সংক্রান্ত গীতার দর্শন।
দ্বিতীয়ত, সকল জীব ও জড়কে আত্মজ্ঞানে বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত।
তৃতীয়ত, প্রকৃতির সাথে আমাদের সহজাত সম্পর্ক উপলব্ধি করার শিক্ষা।
চতুর্থত, কর্মের ফলাফলের আশা না করে কর্ম করে যাওয়ার (কর্মযোগ) শিক্ষা।

হিন্দুধর্মের এসকল মৌলিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার যৌক্তিকতা হয়তো যেকোন সচেতন ও মনোযোগী পাঠকের কাছেই স্পষ্ট বোধ হবে, তাই এদের নিয়ে বিশদে কথা বলার এখানে প্রয়োজন নেই। এখানে বলে রাখা জরুরী, সামগ্রিক হিন্দু ধর্মের প্রাসঙ্গিকতা কেবল এই কয়কটি সিদ্ধান্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। হিন্দু ধর্মের অনেক দর্শন থেকে পৃথকভাবে মূল্যবান অনেক শিক্ষা লাভ করা সম্ভব, তবে এখানে আলোচনার ধারাবাহিকতায় কেবল হিন্দুধর্মের মূলতত্ত্ব হতে সরাসরি উৎসারিত সিদ্ধান্তের মধ্যেই এর প্রাসঙ্গিকতাকে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।

তবে আমার মতে হিন্দুধর্মের যে মতে সকল মানুষের আস্থা আনা বাঞ্চনীয়, সেটা ঠিক হিন্দুধর্মের বিশেষ কোন সিদ্ধান্ত নয়। অন্য অনেক সভ্যতা হয়তো কিছুটা ভিন্নভাবে ঠিক একই উপসংহারে পৌছেছে। এই সিদ্ধান্ত অবশ্যই পাশ্চাত্য আলোকায়ন যুগের মৌলিক সিদ্ধান্তের সাথে তুলনীয়। মানুষের নিজের পছন্দ অনুযায়ী বিভিন্ন পথে পরিভ্রমণ করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে- ষোড়শ শতাব্দীর পর হতে ইউরোপে ক্রমশ জনপ্রিয় হতে শুরু করা এই মৌলিক বিশ্বাসের সাথে ভগবদগীতার সকল পথের অনুমোদনের সিদ্ধান্তের মৌলিক কোন পার্থক্য নেই। প্রতিটি মানুষই তার নিজের ঈশ্বর, বিশ্বাস, এমনকি অবিশ্বাস নির্বাচন করায় সম্পূর্ণ স্বাধীন – গীতার শ্রীকৃষ্ণরূপী ভগবানের এই আপ্তবাক্য আদতে আধুনিক মানুষের চিন্তার স্বাধীনতার অধিকারের সাথেই তুলনীয়। একজন ধর্মপ্রাণ হিন্দু দিন শেষে নিজেকে হিন্দু বলে নির্দ্বিধায় দাবি করতে পারেন, যদি হিন্দু সমাজ বা হিন্দুত্বের রাজনীতির আর সকল বিশ্বাস বা বিধি-বিধানকে বাতিল করেও কেবলমাত্র এই একটি মাত্র সত্যে অবিচল আস্থা রাখতে পারেন। অন্য দিকে আধুনিক অহিন্দু কোন ব্যক্তিকেও এই আপ্তবাক্যে বিশ্বাস রাখতেই হবে; সেক্ষেত্রে এর প্রেরণার উৎস ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু এই তীব্র অস্থির সময়ে চূড়ান্ত সহনশীলতার এ নীতি সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করার আর কোন বিকল্প এ মুহূর্তে আমাদের হাতে নেই।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s