বিতর্ক: অভ্র বনাম বিজয়

১. বিজয় কীবোর্ড আমার মতে অত্যন্ত জরুরী ও প্রয়োজনীয় একটি আবিষ্কার। ফোনেটিক ব্যবহার করে বাংলা টাইপ করা আপাতভাবে সহজ হতে পারে, তবে অন্য ভাষার বর্ণমালা দিয়ে বাংলা লেখা হাস্যকর, তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দুই কারণেই৷ ইংরেজী বর্ণমালা দিয়ে বাংলা ভাষা টাইপ করতে হলে বাংলা ভাষার বিভিন্ন আঙ্গিক, বিশেষত যুক্তবর্ণের ব্যবহার সম্পর্কে অজ্ঞ থাকলেও চলে; ইংরেজী বর্ণমালাকে বিভিন্নভাবে বিন্যস্ত করে এভাবে বাংলা লেখা ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে তাই আপত্তিকর। আমরা ফোনেটিক ব্যবহার করে যখন বাংলা লিখি, তখন আসলে আমরা বাংলাতে লিখছি না, লিখছি ইংরেজীতেই, কেবল সফটওয়্যার তা বাংলাতে পরিবর্তন করে প্রকাশ করছে। আমি ইংরেজী লিখে বাংলায় আমার লেখা প্রকাশ করতে কেনো চাইবো? আমি বাংলাতেই লিখতে চাইবো না কেনো?

২. বিস্ময়কর হলেও সত্যি, ফোনেটিকে বাংলা টাইপ করার চেয়ে বিজয় কীবোর্ডে টাইপ করা দীর্ঘমেয়াদে অনেক বেশি সহজ ও দ্রুততর। এটাই অবশ্য অনুমিত। বিজয় কীবোর্ডে আমি বাংলাতেই লিখছি, যে কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একই শব্দ লিখতে এই কীবোর্ডে অপেক্ষাকৃত কম কী স্ট্রোক দিতে হয়। তাছাড়া যেহেতু আমার ইনপুট আর আউটপুট ভাষা একই, সে কারণে বিজয় অনেক বেশি ইনটুইটিভ; অন্যদিকে ফোনেটিকে আমি ক্রমাগত আমার ইন্টুইশানের বিপরীতে কাজ করছি। এ কারণে ফোনেটিক দিয়ে বাংলা লেখা অনেক কম এফিসিয়েন্ট।

৩. এখন একটি আপাত স্ববিরোধী কথা বলবো। আমি ‘বিজয় কীবোর্ড’ এর পক্ষে থাকলেও আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে (অফিসের কাজ ছাড়া) কম্পিউটারে কখনো ‘বিজয় সফটওয়ার’ ব্যবহার করিনি। আসলে কথাটি স্ববিরোধী নয়৷ কীবোর্ড লে আউট আর টাইপ করার সফটওয়ার এক জিনিস নয়। আমার প্রথম থেকে এখন পর্যন্ত কম্পিউটারে বাংলা লেখার সফটওয়ার একটাই, অভ্র। আমি অভ্র সফটওয়ারেই প্রথম টাইপ করতে শিখি, তবে অবশ্যই ফোনেটিকের পরিবর্তে ইউনিজয় কীবোর্ড ব্যবহার করে। সম্ভবত ২০১২ সালের আশেপাশে হাইকোর্টের রায়ের পর বিজয় কীবোর্ডের উন্মুক্ত ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়ে যায় আর এর পর থেকে অভ্র তাদের নতুন ভার্সন থেকে ইউনিজয় কীবোর্ড বাদ দেয়। আমাকে এখনো তাই পুরোনো অভ্র ব্যবহার করতে হয়।

৪. এবার আমার মূল পয়েন্টে আসি। প্রথমত আমি অন্য কোন ভাষা দিয়ে বাংলা লিখতে চাই না। দ্বিতীয়ত, আমি বিজয় এর মত অপদার্থ কোন ‘সফটওয়ার’ দিয়ে টাইপ করতে চাই না। বিজয় কীবোর্ড একটি বাংলা ভাষা টাইপ করার কীবোর্ড, অনেকটা QWERTY এর মতো। কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির অধীনে এর লাইসেন্স কুক্ষিগত করে রাখা বাংলা ভাষার জন্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি। বিজয়ের আবিষ্কারের জন্যে আমি ব্যক্তিগতভাবে মোস্তফা জব্বারের উপর ঋণী (ফোনেটিকে ‘ঋ’ কিভাবে লিখে?), তবে এরকম আবিষ্কার কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে বছরের পর বছর থাকতে পারে না।

৫. মোস্তফা জব্বারকে এককালীন কিছু রয়েলটি দিয়ে খুশি করে হলেও সরকারের উচিত (আয়রনি, তিনি নিজেই তো এখন সরকার!) বিজয় কীবোর্ডকে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া। হয়তো বিজয় কীবোর্ড আরও আগে থেকে উন্মুক্ত থাকলে এতোদিনে স্মার্টফোনেও আমি বাংলাতে বাংলা টাইপ করতে পারতাম। তাছাড়া এতোদিনে প্রায় সব শিক্ষিত বাংলাদেশীকেই হয়তো ফোনেটিকে বাংলা টাইপ করার অদ্ভূত প্রক্রিয়া আয়ত্ত করতে হতো না।

৬. আমি ব্যক্তিগতভাবে মোস্তফা জব্বার আর মেহেদী হাসান এই দুজনের কাছেই কৃতজ্ঞ। বিজয় কীবোর্ড বা অভ্র সফটওয়ার, এই দুইয়ের কোনটিকে বাদ দিয়ে বাংলায় টাইপ করা আমার পক্ষে অচিন্ত্যনীয়। আমি প্রায় বছর পাঁচেক ধরে আশায় আছি, আবার কোন দিন হয়তো অভ্রের নতুন ভার্সনে আমি ইউনিজয় দিতে টাইপ করতে পারবো৷

কিন্তু, সে আশায় গুড়েবালি! সাত মণ ঘিও পুড়ে না, রাধাও নাচে না!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s