হিন্দুধর্মের স্বরূপ সন্ধানঃ উপসংহার (১ম অংশ)

(পূর্ববর্তী অষ্টম পর্ব এখানে)

হিন্দুধর্মের বিশাল ও বিচিত্র বিশ্বাস-আচার-সংস্কার-দর্শন এর মধ্য থেকে এর একটি মূল সূত্রের সন্ধান লাভ করা কতটুকু আয়াসসাধ্য, তা সম্ভবত এ প্রবন্ধের পাঠকের কাছে ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। এছাড়া, আব্রাহামীয় ধর্মতত্ত্বের কাঠামোতে ভারতীয় ধর্মসমূহকে বুঝতে চাওয়ার প্রবণতাও হিন্দু বা বৌদ্ধ ধর্মের যথার্থ স্বরূপ নির্ণয়ে বাধাস্বরূপ, এ কথাও আমরা বলেছি। শেষতঃ আদৌ হিন্দুধর্মকে একটি সুনির্দিষ্ট সজ্ঞাতে বাঁধা সম্ভব কি না এ নিয়েও অনিশ্চয়তা থেকে যায়। এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বে মূলতঃ পরম্পরাগত জ্ঞানচর্চার ধারা অনুসরণ করার মাধ্যমে হিন্দুধর্মের কিছু মূল বা সাধারণ বৈশিষ্ট্য আমরা ঠিকই নির্ণয় করতে পেরেছি বোধ হয়।

উপসংহারে পুনরুক্তি করে হলেও সংক্ষেপে হিন্দুধর্মের এ প্রধান বৈশিষ্ট্যদের পুনরুল্লেখ প্রয়োজন।

এ প্রবন্ধের সিদ্ধান্তঃ

প্রথম, হিন্দুধর্মের তাত্ত্বিক মূল (origin; root) ঔপনিষদিক ব্রহ্মের ধারণায়। আমি সহ অস্তিত্বশীল জগতের সকল জীবের মধ্যেই এই ব্রহ্ম বিদ্যমান। অর্থাৎ, সকল জীব এক ব্রহ্মের বিভিন্ন প্রকাশস্বরূপ।

দ্বিতীয়, হিন্দুধর্মের আধারে বিবেচিত অনেক বিশ্বাস/ দর্শনে ব্রহ্মের ধারণাই অনুপস্থিত। তাই হিন্দুধর্মের তাত্ত্বিক মূল হিসেবে ব্রহ্মের ধারণাকে বিবেচনা করা গেলেও এই ধারণাটিকেই হিন্দুধর্মের সাধারণ বৈশিষ্ট্য (common feature) বা মিলের জায়গা হিসেবে অভিহিত করা যায় না। যদি হিন্দুধর্মের সাধারণ বৈশিষ্ট্য বলে কোনকিছুকে স্বীকার করতেই হয়, তবে সেই বৈশিষ্ট্যটি নিহিত আছে একটি প্রশ্নের উত্থাপনের মধ্যে। প্রশ্নটি হচ্ছে, জীবের মুক্তি বা মোক্ষ লাভের উপায় কী? বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মসহ হিন্দুধর্মের সকল শাখাই মূলতঃ এই প্রশ্নের সদুত্তর সন্ধান করেছে এবং এর উত্তর দিতে গিয়েই এরা বিভিন্ন পথে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

তৃতীয়, এক দিকে হিন্দুধর্ম বিভিন্ন পথে মুক্তি লাভের উপায় সন্ধান করেছে, অন্য দিকে সময়ে সময়ে বিভিন্ন পথের মধ্যে সংশ্লেষ ও সমন্বয় সাধন করার মাধ্যমে ‘বিভিন্নতার মধ্যে ঐক্য’ স্থাপনও করতে চেয়েছে। এই সমন্বয়ধর্মিতা ও সশ্লেষপ্রবণতা হিন্দুধর্মের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য।

চতুর্থ, আব্রাহামীয় ধর্ম-কাঠামোর তুলনায় হিন্দুধর্মের প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্নতর। হিন্দুধর্মের সাধারণ বা মৌলিক কিছু বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করা গেলেও এই ধর্মের সুনির্দিষ্ট ও সুনিয়ন্ত্রিত কোন সংজ্ঞা দেওয়া আদৌ সম্ভব নয়। কারণ, আব্রাহামীয় ধর্মত্রয়ীর মতো এ ধর্মের কোন কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব নেই, কখনো ছিলোও না। এ কারণে আব্রাহামীয় ধর্মতত্ত্বের আলোকে হিন্দধর্মের সংজ্ঞা বা প্রকৃতি বুঝতে চাওয়া ভ্রমাত্মক।

পঞ্চম, হিন্দুধর্ম প্রকৃতি হতে উদ্ভূত, অর্থাৎ এটি প্রকৃতিকেন্দ্রিক। এর মানে হিন্দুধর্মের বিভিন্ন অভিজ্ঞান লভিত হয়েছ প্রকৃতি থেকে। বলা যায়, প্রকৃতিই হিন্দুধর্মের প্রধান প্রবর্তক।

উপরের প্রথম চারটি বৈশিষ্ট্য এ প্রবন্ধের বিভিন্ন অংশে বিশদভাবে আলোচিত হলেও পঞ্চম বৈশিষ্ট্যটি প্রায় অনালোচিত থেকে গেছে। এ বৈশিষ্ট্যটি নিয়ে আরেকটু বিশদে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

বেদান্তের আলোচনায় আমরা দেখেছিলাম, কিভাবে বৈদিক যুগে বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির অস্তিত্ব ও ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে বৈদিক ঋষিগণ প্রকৃতিকেন্দ্রিক উপাসনার সূত্রপাত করেছিলেন। প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তির উপাসনা হিন্দুধর্মের কোন বিশেষ বৈশিষ্ট্য নয়। মূলতঃ প্রাকৃতিক শক্তির উপাসনার মাধ্যমেই মানুষের ধর্মচেতনার প্রাথমিক প্রকাশ ঘটতে দেখা যায়। প্রাচীন গ্রীক বা রোমান ধর্ম থেকে শুরু করে পৃথিবীর যেখানেই আদিম ধর্মচর্চার নিদর্শন পাওয়া যায়, সেখানেই এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। তবে অন্যান্য জায়গায় এই প্রকৃতিকেন্দ্রিক ধর্মচেতনা বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেনি। গ্রীক ও রোমান প্যাগান ধর্মের সে সম্ভাবনা ছিলো, কিন্তু একত্ববাদী খ্রিস্টধর্ম রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় ধর্ম হওয়ার পর সমগ্র পশ্চিমে ধর্ম, প্রকৃতি থেকে চিরতরের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলো। একমাত্র ভারতবর্ষেই প্রকৃতিকেন্দ্রিক ধর্ম প্রায় দুই হাজার বছর ধরে তাত্ত্বিকভাবে বিকাশ ও পরিণতি লাভ করতে পেরেছে। প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তির উপাসনার মাধ্যমে এই পরম্পরা সূচিত হলেও পরবর্তীতে তা এক দিকে সূক্ষতর দার্শনিক স্তরে ও অন্য দিকে অসংখ্য পৌরাণিক আখ্যানে পরিণতি লাভ করেছে। প্রকৃতিই হিন্দুধর্মের যেকোন দার্শনিক তত্ত্ব বা পৌরাণিক কাহিনীর চূড়ান্ত ভিত্তিভূমি। একটি প্রতিতুলনার মাধ্যমে এ সিদ্ধান্তকে ব্যাখ্যা করা যাক।

খ্রিস্টধর্মের গড এর সাথে উপনিষদের ব্রহ্মের ধারণার তুলনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে। খ্রিস্টধর্ম মতে গড বা ঈশ্বর এই জগতের রচয়িতা বা স্থপতি এবং নিয়ন্ত্রক। এই সিদ্ধান্তে পৌছাতে খ্রিস্টধর্ম যে পদ্ধতির অবতারণা করেছে তা একান্তভাবেই বুদ্ধিবৃত্তিক ও যুক্তিকেন্দ্রিক। যেহেতু কারণ ছাড়া কার্য হয় না, সেহেতু প্রত্যেক কার্যেরই একটি কারণ থাকবে। এভাবে পেছনে যেতে যেতে শেষে আমরা একটি প্রথম বা আদি কারণে পৌছাবো। এই কারণকেই খ্রিস্টধর্মে গড বা ঈশ্বর বলা হচ্ছে ।

অন্য দিকে, শুধুমাত্র প্রকৃতির উপর নির্ভর করেই উপনিষদ ব্রহ্মের ধারণায় পৌছে যায়। যেহেতু প্রকৃতিতে অস্তিত্বশীল জগতের সকল জীব ও জড় একে অপরের সাথে সম্পর্কিত, সেহেতু মূলতঃ এরা একই সত্তার বিভিন্ন প্রকাশ, যাকে বলা হচ্ছে ব্রহ্ম।

এই দ্বিবিধ তাত্ত্বিক কাঠামোকে পাশ্চাত্য দর্শনের যুক্তিবাদী (Rationalist) ও অভিজ্ঞতাবাদী (Empiricist) ধারাদ্বয়ের সাথে তুলনা করা যায়। যুক্তিবাদী ধারাতে আব্রাহামীয় ধর্মসমূহ অনেক পথ পাড়ি দিয়েছে; কিন্তু, প্রকৃতিকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতাবাদী ধারায় একমাত্র হিন্দুধর্ম ব্যতীত অন্য কোন ধর্মই বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেনি।

উপসংহারের দ্বিতীয় অংশে আমরা দেখবো, আধুনিক সময়ে হিন্দুধর্মের কোন প্রাসঙ্গিকতা আদৌ আছে কী না।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s