গল্প: স্কেচ-৬

এইবার ঢাকা শহরের যেনো কী হয়েছে! চৈত্র মাস পার হয়ে গেলো এখনও তেমন গরমই পড়লো না। গরম তো দূরের কথা, উল্টো সারাদিন ভরা বর্ষার মতো লাগাতার বৃষ্টি লেগেই আছে। এই শহরের সাথে বৃষ্টি একদমই খাপ খায় না। প্রতিবার বৃষ্টিতে প্রকৃতির নবযৌবন লাভ করার কথা। সেখানে এ শহরে প্রকৃতির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়াই খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার চেয়েও কষ্টসাধ্য। আর শহরের যা অবয়ব! একে যৌবন ফিরিয়ে দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করতে কার বয়েই গেলো! রীতিমতো ধুঁকতে ধুঁকতে আর ক’দিন পরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার দশা যে শহরের, সে শহরের জন্য বৃষ্টি কেবলই বিড়ম্বনা বই আর কিছু তো নয়।

কলকারখানায় যেমনি পালে পালে ফিনিশড প্রোডাক্ট বের হয়ে আসে, এই মুহূর্তে এই শহরেও তেমনি দলে দলে লোক বেরিয়ে পড়েছে নানা কাজে। কতজনের কতরকম কাজ! এই সময়ে একেকজনের মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকা একেকরকম কাজের চিন্তাকে যদি ধরে রাখার চেষ্টা করা যেতো তাহলে হয়তো আধুনিক নগর সভ্যতার একটা সামগ্রিক চিত্র আমরা পেয়ে যেতাম। কিন্তু আজকে সকালে অফিসের আসন্ন কাজের চিন্তাকে ছাপিয়ে অফিসে যাওয়ার চিন্তাতেই সবাই উদ্বিগ্ন। শহরের যত আবর্জনা সব বৃষ্টির জলের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে পাতাল থেকে একেবারে মর্ত্যলোকে উঠে এসেছে। সে সঙ্গে বৃষ্টিরওতো বিরাম নেই। সেই একতারে তখন থেকে তার কন্ঠসাধা চলছে তো চলছেই। আগাগোড়া কৃত্রিমতায় বাঁধা এই শহরে এই প্রাকৃতিক সঙ্গীত বড্ড বেসুরো বড্ড অসঙ্গত লাগে।

আবদুল করিমের ভাগ্য সুপ্রসন্ন সে এরই মধ্যে একটি রিকশা বাগিয়ে নিতে পেরেছে। এমন সময়ে একটি রিকশায় উঠে যেতে পারা মানেই মোটামুটি নিশ্চিন্তি। রিকশাওলাদের এক ধরণের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় থাকে, যার প্রভাবে কিভাবে যেনো তারা এই নষ্ট মহাসাগরে ঘাঁপটি মেরে লুকিয়ে থাকা শহরের যতো খানা-খন্দ-ডোবা এড়িয়ে যেতে পারে। রিকশার আরোহীরা সচরাচর অবশ্য রিকশাওলাদের এ ধরণের বিশেষ গুণের খবর রাখে না। তারা একবার রিকশায় উঠে সকল ভাবনা রিকশাওলাদের সমর্পিত করে নিশ্চিন্ত থাকতেই বেশি পছন্দ করে।

তবে আমাদের আবদুল করিম একটু সংবেদনশীল মানুষ। তার পরিবেশের থেকে নিজেকে সে কখনো বিচ্যূত করে দেখতে পারে না। তাই সে সারাটা রাস্তায় রিকশাওলাকে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে যেতে থাকে। রিকশাওলা স্বাভাবিকভাবেই বেশ বিরক্ত হয়। কোন কাজে বিশেষজ্ঞ কাওকে আমজনতার কেউ একজন এসে উপদেশ দেওয়া শুরু করলে বিশেষজ্ঞের যে ধরণের বিরক্তির উৎপাদন ঘটে, আমাদের রিকশাওলারও এখন ঠিক সে ধরণের অনুভূতি হয়।

হঠাৎ চলতি পথে রিকশাওলার ফোন বেজে উঠলে সে খুব দ্রুত রিকশা সাইডে নিয়ে যেতে থাকে। আবদুল করিম বলে উঠে, “মামা! এই বৃষ্টির মধ্যে ফোন ধরার কী দরকার!”

“মামা, আমার বাপের অবস্থা ভালা না। খারাপ খবর আইতে পারে। ফোনটা ধরতেই হইবো।“ রিকশাওলা সাইড করতে করতে উত্তর দেয়।

এ আবার কী আপদ! মনে মনে চিন্তা করে আবদুল করিম। চিন্তা করে আর রিকশাওলার মুখের অভিব্যক্তি খেয়াল করতে থাকে। রিকশাওলার মুখে হঠাৎ রাজ্যের আঁধার নেমে আসতে শুরু করলে সে বুঝতে পারে, খবর ভালো না।

এ মুহূর্তে আবদুল করিমের মস্তিষ্কে সৃষ্টি হয় এক অসাধারণ প্রতিক্রিয়া। এই মস্তিষ্ক একটি একুশ শতকী আধুনিক শহুরে মানুষের মস্তিষ্ক; তাই কোন ধরণের জেনেটিক ইমপালস এর ধার না ধেরে বিচিত্র এক পথে এই মস্তিষ্ক তার প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করে।

সে, মানে আবদুল করিমের মস্তিষ্ক, প্রথমেই চিন্তা করে, এখন তার কী অনুভূতি হওয়া উচিত। রিকশাওলার বাবা মারা গেছে, তাই এ ঘটনায় স্বাভাবিকভাবে শোকের অনুভূতিই আসার কথা। কিন্তু ঘটনা তো এখানে শুধু একটি নয়, দুইটি। রিকশাওলার বাবা মারা যাওয়ায় সে যদি এখন বেঁকে বসে, আর যেতে রাজি না হয়, তাহলে কী হবে? অফিসে দেরি করে গেলে যে ঝামেলায় আবদুল করিমকে পড়তে হবে, তার আগাম চিন্তাও তার মস্তিষ্ককে তাই সামলাতে হয়। তাই যদিও এক মুহূর্তের জন্য সে শোকের অনুভূতিকে যথার্থ বিবেচনা করে, পর মুহূর্তেই শোকের জায়গায় বিরক্তি ও দুর্ভাবনা এসে শোকের তীব্রতাকে অনেকটুকুই কমিয়ে দেয়।

অবশেষে বিরক্ত ও দুর্ভাবনায় কাতর আবদুল করিম অপেক্ষা করে রিকশাওলা কী বলে তা দেখার জন্য। এদিকে রিকশাওলা ধীরেসুস্থে ফোন পলিথিনে মুড়িয়ে শার্টের পকেটে রেখে কিছুক্ষণের জন্য স্থবির হয়ে থাকে। নৈঃশব্দের এই অবিচ্ছিন্ন মুহূর্ত আবদুল করিমকেও কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ করে।

এই ক্ষণকালের অসহ বিরতির পর নিঃশব্দ রিকশাওলা অতঃপর চালকের আসনে উঠে বসে রিকশা চালানোর প্রস্তুতি নেয়।

খুব সন্তপর্ণে আবদুল করিম জিজ্ঞেস করে, “ কী মামা? খারাপ খবর নাকি?”

স্বচ্ছ দীঘির জল যেরকম শান্ত, অনেকটা সেরকম শান্তভাবে রিকশাওলা উত্তর দেয়, “ হ, মামা। অনেক বয়স হইসিলো তো। মইরা গিয়া ভালোই হইসে। বাঁইচা থাকলে হুদাই কষ্ট পাইতো।“

কিন্তু, রিকশাওলার এই নির্লিপ্ত উত্তরে আবদুল করিম হতাশ হয়। কেমন যেনো একটু শোকের অনুভূতিও হয়!

এর থেকে রিকশাওলা যদি আর যেতে না চাইতো, তাহলেই হয়তো আবদুল করিমের জন্য এই মুহূর্তটি আরও সহজ হতো, আরও নির্ভার হতো।

‘অদ্ভূত মনোটোনাস এই শহরে’ শোকের এহেন আলটপকা শিহরণ কেবল অস্বস্তিই বাড়ায়, কোন কাজে তো লাগে না।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s