নারীবাদী বঙ্কিমচন্দ্র: প্রথম পর্ব

১. বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক সাহিত্যিক সম্ভবত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; জীবিত ও মৃত দুই অবস্থাতেই। জীবিতকালে স্বদেশী ও ইংরেজ উভয় কর্তৃক তাকে প্রতিনিয়ত অনেক অপমান, বিদ্বেষ, ঘৃণা সহ্য করতে হয়েছিলো; আবার মৃত্যুর একশো বছরের বেশি সময় পরেও শিক্ষিত-অশিক্ষিত মহল নির্বিশেষে সব ধরণের বাঙ্গালির বিষোদগার মৃত বঙ্কিমকে আজও ক্রমাগত ভোগ করে যেতে হয়। অনেক অল্পবিদ্যায় গর্বিত শিক্ষিত বাঙ্গালি এমনকি তাকে সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যায়িত করার হঠকারিতা দেখায়। আবার এর বিপরীতে আর এক মহল তাকে উগ্র হিন্দুত্বের প্রবর্তক হিসেবে পূজা করার অবিমৃষ্যকারিতাও প্রদর্শন করে। এসব প্রবণতার একমাত্র কারণ শিক্ষিত অশিক্ষিত নির্বিশেষে পড়া এবং জানার প্রতি বাঙ্গালির তীব্র অনীহা ও বিতৃষ্ণা। যেকোন সচেতন ও বিদগ্ধ পাঠক বঙ্কিমচন্দ্র পাঠমাত্রই তার অনন্যসাধারণ বৌদ্ধিক উন্মেষ, অপূর্ব সৃজনশীল প্রতিভা এবং নিবিড় সংবেদনশীল মানবিকতার পরিচয়ে বিস্মিত ও মুগ্ধ হতে বাধ্য। বঙ্কিমের রচনার নিবিড় পাঠে সাম্প্রদায়িকতা বা উগ্র হিন্দুত্বের প্রতিভূ হিসেবে তাকে কল্পনা করার কোন সূত্র পাওয়া একেবারেই অসম্ভব। এছাড়া তৎকালীন বাংলা তথা ভারতবর্ষের ইতিহাস সাহিত্য সংস্কৃতি সম্পর্কে একটু পূর্বধারণা থাকলে এই উপসংহারে পৌছাতে দেরি হওয়ার কথা না যে, ভারতবর্ষ এবং প্রধানত বাংলাকে এক নিমিষে তীব্র অন্ধকার থেকে আধুনিকতার অত্যুজ্বল আলোকে পৌছে দেওয়া মনীষীদের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্রই সর্বপ্রধান, অগ্রগণ্য, এবং সর্বশ্রেষ্ঠ। যদি বলা হয় বাংলা ভাষায় উপন্যাস, ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি-তত্ত্ব, সাহিত্য সমালোচনা, ধর্মতত্ত্ব, রসরচনা- এ সবকিছুর প্রথম সার্থক লেখক বঙ্কিমচন্দ্র, তাহলে মোটেই অত্যুক্তি হয় না। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাতে বাংলা ভাষায় বঙ্কিমের আগেও লেখার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু বঙ্কিম একাই বাংলা ভাষায় জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাতে এমন চিন্তার প্রসারণ ঘটালেন যে, বাংলা ভাষা রাতারাতি একটি অসংস্কৃত ভাষা থেকে উন্নত যেকোন ধরণের চিন্তা ধারণ করার উপযোগী ভাষা হিসেবে পরিণতিপ্রাপ্ত হলো।

 

ভারতবর্ষ তথা বাংলায় অন্য অনেক কিছুর মতো নারীবাদী চিন্তার উন্মেষেও বঙ্কিমচন্দ্রই অগ্রগণ্য। তার নিজের সমাজ ও সময় থেকে তিনি কতটুকু এগিয়ে ছিলেন, তা তার নারীবাদী রচনার সময়কাল ও বিষয়বস্তুর দিকে তাকালেই আমরা নিঃসন্দেহ হতে পারি।

 

পুরুষের সমান অধিকার নারীরও থাকা বাঞ্চনীয়, এ ধরণের কথা মানুষের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শোনা যায় ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে মেরী ঔলস্ট্যানক্রাফট এর ‘এ ভিন্ডিকেশন অফ দ্য রাইটস অফ উইমেন’ নামক মহান গ্রন্থে। ঔলস্ট্যানক্রাফট অবশ্য দীর্ঘদিন ছিলেন তীব্র অন্ধকারে অনুজ্বল মাটির প্রদীপের মতো নিঃসঙ্গ। নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিয়ে চিন্তাভাবনা করার মতো বৌদ্ধিক পরিণতি তার সময়ের মানুষের আসেনি। অনেক বছর পরে ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে মনীষী জন স্টুয়ার্ট মিল ‘সাবজেকশান অফ উইমেন’ লেখার মাধ্যমে আবার এ বিষয়কে সবার সামনে আনেন এবং এর পর থেকে পাশ্চাত্য শিক্ষিত মহল নারী অধিকারের ব্যাপারে সচকিত হয়। বিস্ময়কর হলেও সত্যি, মিল এর সাবজেকশান এর মাত্র দশ বছর পরে ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে সুদূর বাংলায় বঙ্কিমচন্দ্র রচনা করেন ‘সাম্য’ নামক এক অপূর্ব গ্রন্থ, যার পঞ্চম পরিচ্ছেদটিই বাংলা সাহিত্যের প্রথম নারীবাদী রচনা। সতীদাহ প্রথা রোধ, বিধবা বিবাহ প্রবর্তন, বহুবিবাহ রোধ এরকম সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে এর পূর্বেই রামমোহন রায় বা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগররা কাজ করেছিলেন, কিন্তু সামগ্রিকভাবে এই উপমহাদেশে নারী পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার কথা প্রথম বঙ্কিমচন্দ্রেরে লেখনীতেই ঘোষিত হলো। যদিও তৎকালীন বাংলা বা ভারতবর্ষ তৎকালীন ইউরোপ থেকে বৌদ্ধিক চর্চায় যোজন পরিমাণ পিছিয়ে ছিলো, বঙ্কিমচন্দ্রের মানস ছিলো তৎকালীন শ্রেষ্ঠ ইউরোপীয় চিন্তকদের সমতুল্য ও সমসাময়িক। এ কারণে মিলের বৈপ্লবিক ধারণাকে সংশ্লেষিত করে নিমিষেই সে ধারণার একটি স্বদেশী সংস্করণ নির্মাণ করার আপাত অসম্ভব কাজ বঙ্কিমচন্দ্রের পক্ষে ছিলো অনায়াসলব্ধ। আরেকটি বিস্ময়কর ব্যাপার, বঙ্কিমচন্দ্র যে বছর বাংলার প্রথম নারীবাদী সাহিত্য লিখলেন (১৭৭৯), তার ঠিক পরের বছরেই (১৭৮০) বাংলার প্রথম নারীবাদী নারী বেগম রোকেয়া জন্মগ্রহণ করেন। বেগম রোকেয়ার লেখা প্রকাশিত হওয়ার আগে সুদীর্ঘকাল ধরে বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্রই ছিলেন নারীবাদী সাহিত্যের একমাত্র নিঃসঙ্গ রচয়িতা।

 

২. ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দের সামাজিক পটভূমির সাথে বর্তমান কালের সামাজিক পটভূমির অমিল অনেক বেশি হওয়াই স্বাভাবিক, তাই সাম্য এর বক্তব্য বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে অনেকটা অপ্রাসঙ্গিক হওয়ার কথা। কিন্তু মহৎ চিন্তক-দার্শনিক-সাহিত্যিকদের রচনার প্রধান দুই বৈশিষ্ট্য চিরন্তনতা ও সার্বজনীনতা। এ দুই গুণ বঙ্কিমচন্দ্রের প্রায় সব লেখাতেই উপস্থিত; তাই সাম্য প্রায় দেড়শো শতাব্দী পূর্বে রচিত হলেও এর অনেক বক্তব্য সে সময় ও স্থানকে অতিক্রম করে চিরকালের সব মানুষের জন্য প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

 

বঙ্কিমচন্দ্রের অধিকাংশ লেখাই বাংলা সাহিত্যে অবিস্মরণীয় বিভিন্ন কারণে; তবে এদের মধ্যে ‘সাম্য’ কিছুটা হলেও অসাধারণ প্রধানত তিনটি কারণে:

 

ক) বাংলা সাহিত্যের প্রথম সাম্যবাদী (Communism নয়, Equality অর্থে) রচনা এটি। এই প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র দার্শনিকভাবে সাম্যের মূলনীতি প্রমাণ করেন।

খ) এই প্রবন্ধের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো বাংলার জমিদার কর্তৃক প্রজাপীড়নের বাস্তব পূর্ণাঙ্গ চিত্র ব অঙ্কিত হয়। শুধু সমস্যা প্রদর্শনেই বঙ্কিম কখনও ক্ষান্ত হননা; এক্ষেত্রেও এ সমস্যা সমাধানের ইঙ্গিত তার প্রবন্ধে ছিলো।

গ) সাম্য গ্রন্থের পঞ্চম পরিচ্ছেদই বাংলা সাহিত্যের প্রথম নারীবাদী রচনা।

 

এই প্রবন্ধে আমাদের আলোচনা মূলতঃ তৃতীয় পয়েন্টটিকে ঘিরেই আবর্তিত হবে।

 

৩. সব মানুষের সমান অধিকার থাকা আবশ্যক, এই তত্ত্ব সুপ্রমাণ করার পর সাম্য গ্রন্থের পঞ্চম পরিচ্ছেদে বঙ্কিম নারী পুরুষের ক্ষেতেও এ মূলনীতিকে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিলেন। প্রথমেই তৎকালীন সময়ে নারী পুরুষের চারটি বৈষম্যকে তিনি চিহ্নিত করেনঃ

 

“১ম। পুরুষকে বিদ্যাশিক্ষা অবশ্য করিতে হয়; কিন্তু স্ত্রীগণ অশিক্ষিতা থাকে।

২য়। পুরুষের স্ত্রীবিয়োগ হইলে, সে পুনর্বার দারপরিগ্রহ করিতে অধিকারী। কিন্তু স্ত্রীগণ বিধবা হইলে, আর বিবাহ করিতে অধিকারিণী নহে; বরং সর্বভোগসুখে জলাঞ্জলি দিয়া চিরকাল ব্রহ্মচর্যানুষ্ঠানে বাধ্য।

৩য়। পুরুষে যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাইতে পারে, কিন্তু স্ত্রীলোকে গৃহপ্রাচীর অতিক্রম করিতে পারে না।

৪র্থ। স্ত্রীগণ স্বামীর মৃত্যুর পরেও অন্য স্বামীগ্রহণে অধিকারী নহে, কিন্তু পুরুষগণ স্ত্রী বর্তমানেই, যথেচ্ছ বহুবিবাহ করিতে পারেন।”

 

পরবর্তীতে এই চারটি বৈষম্যের ক্ষেত্রে বিস্তারিত আলোচনা করে এই চার ক্ষেত্রেই সকল ধরণের বৈষম্য দূর করা আবশ্যক মর্মে ঘোষণা দিয়ে বঙ্কিম উক্ত পরিচ্ছেদ সমাপ্ত করেন।

 

পূর্বেই বলা হয়েছে, এই অনুচ্ছেদের অনেক অংশই এমনকি বর্তমান সময়েও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এই প্রবন্ধে আমরা মূলতঃ এই অনুচ্ছেদ হতে বিভিন্ন অংশ নির্বাচন করে বর্তমান সময়ের সাথে এদের প্রাসঙ্গিকতা নির্ণয়ের চেষ্টাই করবো।

 

একঃ নারীশিক্ষা প্রসঙ্গে বিরুদ্ধ এক পক্ষের যুক্তি, নারীরা যদি বাইরে বিদ্যাশিক্ষায় ব্রতী হয়, তাহলে ঘর সামলানোর কাজ করবে কারা? এর উত্তরে বঙ্কিম বলেন,

 

“সাম্যতত্ত্বান্তর্গত সমাজনীতি সকল পরস্পরে দৃঢ় সূত্রে গ্রন্থিত, যদি স্ত্রী পুরুষ সর্বত্র সমানাধিকারবিশিষ্ট হয়, তবে ইহা স্থির যে, কেবল শিশুপালন ও শিশুকে স্তন্যপান করান স্ত্রীলোকের ভাগ নহে, অথবা একা স্ত্রীরই ভাগ নহে। যাহাকে গৃহধর্ম বলে, সাম্য থাকিলে স্ত্রী পুরুষ উভয়েরই তাহাতে সমান ভাগ। একজন গৃহকর্ম লইয়া বিদ্যাশিক্ষায় বঞ্চিত হইবে, আর একজন গৃহকর্মের দুঃখে অব্যাহতি পাইয়া বিদ্যাশিক্ষায় নির্বিঘ্ন হইবে, ইহা স্বভাবসঙ্গত হউক বা না হউক, সাম্যসঙ্গত নহে।”

 

এ কথা সত্যি যে, নারীর সার্বজনীন শিক্ষার অধিকার এখন মোটামুটি স্বীকৃত। তবে এখানেও কথা থাকে। বর্তমান সময়ে নারীর শিক্ষার উদ্দেশ্য কী এ প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে গেলে খুব একটা আশাবাদী এখনও হওয়া যায় না। এখনও অনেকেই নারী শিক্ষাকে কেবল বিয়ের বাজারে অধিক যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবেই বিবেচনা করেন। এ কারণে দেখা যায় যে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পরও অধিকাংশ নারী মূলত গৃহকর্মেই নিযুক্ত থাকেন। স্বাভাবিকভাবেই, গৃহকর্মের ভার যদি একা নারীর উপর পড়ে, তাহলে তার পক্ষে বিয়ের পরে বিদ্যাশিক্ষা বা তাকে কাজে লাগানোর পথ ও উপায় অনেক সংকুচিত হয়ে পড়ে। এ কারণেই বঙ্কিমের সমাধান গৃহকর্মে নারী পুরুষের সমান ভাগ হওয়া আবশ্যক- এ মূলনীতি এখনও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

 

দুইঃ আমাদের সমাজে এখনও বিধবাবিবাহ প্রায় অনুচ্চারিত একটি শব্দ। যদিও বিধবাবিবাহের বিরুদ্ধে শিক্ষিত সমাজ প্রকাশ্যে কিছু বলার স্পর্ধা আর রাখে না, তথাপি বিধবার পুর্নবার বিয়ে করাকে এখনও বৃহত্তর সমাজ মন থেকে মেনে নিতে পারে না। নারীর কাছে পুরুষকেন্দ্রিক সমাজের দাবি সবসময়ই বেশি; তাই পতির মৃত্যুতে পত্নীর যে পরিমাণ শোকাবিহ্বল হওয়ার আশা এ সমাজ করে, পত্নীর মৃত্যুতে পতির সমপরিমাণ শোকাবিহ্বল হওয়ার দাবি এ সমাজ করে না। বঙ্কিমের সময় অপেক্ষা বিধবাবিবাহের প্রচলন ও অনুমোদন আমাদের সময়ে অধিক হলেও বঙ্কিমের নিম্নোক্ত প্রশ্নকে তাই এখনও আমরা প্রাসঙ্গিক বলতে বাধ্য :

 

“বিধবার চিরবৈধব্য যদি সমাজের মঙ্গলকর হয়, তবে মৃতভার্য পুরুষের চিরপত্নীহীনতা বিধান কর না কেন? তুমি মরিলে, তোমার স্ত্রীর আর গতি নাই, এজন্য তোমার স্ত্রী অধিকতর প্রেমশালিনী; সেইরূপ তোমার স্ত্রী মরিলে, তোমারও আর গতি হইবে না, যদি এমন নিয়ম হয়, তবে তুমিও অধিকতর প্রেমশালী হইবে। এবং দাম্পত্য সুখ, গার্হস্থ্য সুখ দ্বিগুণ বৃদ্ধি হইবে। কিন্তু তোমার বেলা সে নিয়ম খাটে না কেন? কেবল অবলা স্ত্রীর বেলা সে নিয়ম কেন?”

 

তিনঃ বঙ্কিম কর্তৃক উল্লেখিত তৃতীয় বৈষম্য অবশ্য এখনও আমাদের সমাজে প্রবলভাবে বিদ্যমান। নারীকে এখনও গৃহপ্রাচীরের মধ্যে বন্দী রাখার সকল ব্যবস্থা রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার সকলেই বিভিন্নভাবে করে যাচ্ছে। এই ব্যবস্থার স্বপক্ষে যুক্তি এতোটাই দুর্বল যে, বঙ্কিম একে ‘জঘন্য অধর্মপ্রসূত বৈষম্য’ বলতে তাই বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেননি:

 

“পুরষের যত প্রকার দৌরাত্ম্য আছে, স্ত্রীপুরুষে যত প্রকার বৈষম্য আছে, তন্মধ্যে আমাদিগের উল্লিখিত তৃতীয় প্রস্তাব, অর্থাৎ স্ত্রীগণকে গৃহমধ্যে বন্য পশুর ন্যায় বদ্ধ রাখার অপেক্ষা নিষ্ঠুর, জঘন্য অধর্মপ্রসূত বৈষম্য আর কিছুই নাই। আমরা চাতকের ন্যায় স্বর্গমর্ত্য বিচরণ করিব, কিন্তু ইহারা দেড় কাঠা ভূমির মধ্যে, পিঞ্জরে রক্ষিতার ন্যায় বদ্ধ থাকিবে। পৃথিবীর আনন্দ, ভোগ, শিক্ষা, কৌতুক, যাহা কিছু জগতে ভাল আছে, তাহার অধিকাংশে বঞ্চিত থাকিবে। কেন? হুকুম পুরুষের।”

 

এভাবে এই বৈষম্যের মূলনীতি সাধারণ যুক্তিবোধ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার পর নারীর বাইরে বের হওয়ার বিভিন্ন বাধা নিয়ে বঙ্কিম আলোচনা করেন। এ প্রসঙ্গে বিরুদ্ধপক্ষের একটি যুক্তি এবং সে সম্পর্কিত বঙ্কিমের যুক্তিখন্ডন নিয়ে একটু আলোচনা করার লোভ সংবরণ করতে পারছি না।

 

বঙ্কিমচন্দ্রের অনেক পরিচয়ের একটি তিনি হিন্দুধর্মের একজন প্রধান সংস্কারক ও নতুন ব্যাখ্যাতা। এ কথা অনস্বীকার্য যে, তিনি ভারতবর্ষীয় বা বাঙ্গালি সমাজ নিয়ে বলার সময় মূলত হিন্দু সমাজ নিয়েই কথা বলেছেন। কেন শুধু হিন্দু সমাজ নিয়েই তিনি বলেছেন, মুসলমান সমাজ কেন তার দৃষ্টি এড়িয়ে গেলো, এ বিষয় স্বতন্ত্র আলোচনার দাবিদার বলে এখানে আপাতত এ আলোচনায় আমরা ঢুকছি না। তবে, এতটুকু ইঙ্গিত অন্তত দিয়ে রাখি, হিন্দুধর্ম ও সমাজকে যে তীব্র ভাষায় বঙ্কিম আক্রমণ করেছেন, মুসলমানের ধর্ম ও সমাজকে এতোটা তীব্র ভাষায় আক্রমণ করা তখন কেন, এখনও প্রায় অসম্ভব।

 

পুরুষের মতো নারীরও যত্রতত্র ভ্রমণের অধিকার আছে, এ ঘোষণা দেওয়ার পর বঙ্কিম বিরুদ্ধপক্ষীয়দের একটি বক্তব্যের অবতারণা করেন। এ পক্ষের বক্তব্য, নারীগণ বাইরে বের হলে পুরুষের সাথে যথেচ্ছ মেলামেশার প্রভাবে ধর্মভ্রষ্ট হবেন। এ প্রসঙ্গে ইউরোপীয় নারীদের যথেচ্ছ ভ্রমণের অধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিলে এ পক্ষ বলে ওঠেন, “সে সকল সমাজের স্ত্রীগণ, হিন্দুমহিলাগণ অপেক্ষা ধর্মভ্রষ্ট এবং কলুষিতস্বভাব বটে।” এই কথার জবাব দিতে গিয়ে বঙ্কিম যে উক্তিটি করেন, সেটি চিরস্মরণীয়ঃ

 

“ধর্মরক্ষার্থ যে স্ত্রীগণকে পিঞ্জরবদ্ধ রাখা আবশ্যক, হিন্দুমহিলাগণের এরূপ কুৎসা আমরা সহ্য করিতে পারি না। কেবল সংসারে লোকসহবাস করিলেই তাহাদিগের ধর্ম বিলু্প্ত হইবে, পুরুষ পাইলেই তাহারা কুলধর্মে জলাঞ্জলি দিয়া তাহার পিছু পিছু ছুটিবে, হিন্দু স্ত্রীর ধর্ম এরূপ বস্ত্রাবৃত বারিবৎ নহে। যে ধর্ম এরূপ বস্ত্রাবৃত বারিবৎ, সে ধর্ম থাকা না থাকা সমান—তাহা রাখিবার জন্য এত যত্নের প্রয়োজন কি? তাহার বন্ধনভিত্তি উন্মূলিত করিয়া নূতন ভিত্তির পত্তন কর।”

 

যে ধর্ম নারীর যথেচ্ছ ভ্রমণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয় না, প্রয়োজনে সেই ধর্মকে বিলুপ্ত করা হোক, তথাপি নারীর প্রাপ্য অধিকারের স্বীকৃতি প্রদানে কোন শৈথিল্য প্রদর্শন করা যাবে না- অচল অনড় প্রাচীন হিন্দুসমাজের প্রতি বঙ্কিমের এহেন উক্তি নিঃসন্দেহে বৈপ্লবিক ও দুঃসাহসিক। মূলতঃ বঙ্কিমচন্দ্রের এ উক্তি শুধু হিন্দু সমাজ কেন, সকল সময়ের সকল সমাজের জন্যই প্রাসঙ্গিক। যে ভিত্তি মানুষকে তার প্রাপ্য অধিকার দেয় না, সে ভিত্তির সমূল বিনাশই একমাত্র সমাধান। অথচ আমরা এখন বঙ্কিমচন্দ্রের এহেন উক্তি সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে যা প্রাচীন, পুরাতন, প্রতিক্রিয়াশীর ও প্রগতিবিরুদ্ধ, তাকেই আরও প্রবলভাবে আঁকড়ে ধরি। আমাদের সমাজে ও সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্রের ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যা্ওয়াকে তাই আর অবিশ্বাস্য মনে হয় না। এই সমাজ পুরাতন সঙ্কীর্ণ ডোবাতে গড়াগড়ি খেতেই অভ্যস্ত, সাগরের মতো বিশাল ও অভিনব বঙ্কিমচন্দ্রে অবগাহন করতে গেলে তাই এ সমাজের নাভিশ্বাস উঠার উপক্রম হয়।

 

(পরবর্তী পর্বে সমাপ্য)

Advertisements

One thought on “নারীবাদী বঙ্কিমচন্দ্র: প্রথম পর্ব

  1. Miraz Mirazee

    অনেক বড় লেখা। সুখপাঠ্য বলে পড়ে ফেলতে পারলাম। ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s