চিরন্তন বাংলা সাহিত্যঃ বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন (বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)

(ভূমিকাঃ সন্দেহাতীতভাবেই বাংলা সাহিত্যের এখন প্রবল দুঃসময় যাচ্ছে। মৌলিক বা চিন্তা উদ্রেক করার মতো লেখা বাংলায় এখন খুব কমই লেখা হয়। তাছাড়া, দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সিংহভাগ সাহিত্যচর্চার মতো ‘অপ্রয়োজনীয়’ বিষয় নিয়ে একটু্ও আগ্রহী নয়। সমাজজীবনের সর্বত্র যে অনড় জড়তা, তার প্রভাবেই সাহিত্যের উৎসমুখ্ও প্রায় রুদ্ধ হয়ে গেছে, এ কথা বলাই যায়। এমন সময়ে এ নিশ্চল সমাজে পুনরায় গতি আনতে যথার্থ লেখক/ সাহিত্যিকদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে; সৃষ্টি করতে হবে মহৎ সাহিত্য।

 

এ ভাবনা থেকে মনে হলো, মূলতঃ নিজস্ব এই ব্লগটিতে নিজের লেখা ছাড়াও বাংলা সাহিত্যের অনুপ্রেরণাকারী ও দিকনির্দেশক কিছু লেখা প্রকাশ করাই যায়।

 

বাংলা ভাষাকে উন্নত চিন্তার বাহনকারী মাধ্যমে পরিণত করা মহান সাহিত্যিক, দার্শনিক, ভাবুক, ইতিহাসবিদ, সমাজতাত্ত্বিক, ধর্মপ্রচারক মহর্ষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর একটি লেখা দিয়েই এ সিরিজ শুরু করছি। বঙ্কিমের এ লেখায় নবীন বাংলা সাহিত্যিকদের উদ্দেশ্যে বঙ্কিমচন্দ্র যে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, তা আজকের দিনের নবীন বাংলা সাহিত্যিকদের জন্যেও সমভাবে প্রযোজ্য বলে বোধ হয়। যে বিশেষ ক্রান্তিকালে বঙ্কিমচন্দ্র এ লেখা লিখেছেন, প্রায় সেরকম একটি ক্রান্তিকালে আমরা আছি; তাই, এ অসময়ে আমাদের অগ্রজ পূর্বসূরীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার বিশেষ দরকার আছে বলে আমি মনে করি।)

 

বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন

১। যশের জন্য লিখিবেন না। তাহা হইলে যশও হইবে না, লেখাও ভাল হইবে না। লেখা ভাল হইলে যশ আপনি আসিবে।

২। টাকার জন্য লিখিবেন না। ইউরোপে এখন অনেক লোক টাকার জন্যই লেখে, এবং টাকাও পায়; লেখাও ভাল হয়। কিন্তু আমাদের এখনও সে দিন হয় নাই। এখন অর্থের উদ্দেশ্যে লিখিতে গেলে, লোক-রঞ্জন-প্রবৃত্তি প্রবল হইয়া পড়ে। এখন আমাদিগের দেশের সাধারণ পাঠকের রুচি ও শিক্ষা বিবেচনা করিয়া লোক-রঞ্জন করিতে গেলে রচনা বিকৃত ও অনিষ্টকর হইয়া উঠে।

৩। যদি মনে এমন বুঝিতে পারেন যে, লিখিয়া দেশের বা মনুষ্যজাতির কিছু মঙ্গল সাধন করিতে পারেন, অথবা সৌন্দর্য্য সৃষ্টি করিতে পারেন, তবে অবশ্য লিখিবেন। যাঁহারা অন্য উদ্দেশ্য লেখেন, তাঁহাদিগকে যাত্রাওয়ালা প্রভৃতি নীচ ব্যবসায়ীদিগের সঙ্গে গণ্য করা যাইতে পারে।

৪। যাহা অসত্য, ধর্ম্মবিরুদ্ধ; পরনিন্দা বা পরপীড়ন বা স্বার্থসাধন যাহার উদ্দেশ্য, সে সকল প্রবন্ধ কখনও হিতকর হইতে পারে না, সুতরাং তাহা একেবারে পরিহার্য্য। সত্য ও ধর্ম্মই সাহিত্যের উদ্দেশ্য। অন্য উদ্দেশ্যে লেখনী-ধারণ মহাপাপ।

৫। যাহা লিখিবেন, তাহা হঠাৎ ছাপাইবেন না। কিছু কাল ফেলিয়া রাখিবেন। কিছু কাল পরে উহা সংশোধন করিবেন। তাহা হইলে দেখিবেন, প্রবন্ধে অনেক দোষ আছে। কাব্য নাটক উপন্যাস দুই এক বৎসর ফেলিয়া রাখিয়া তার পর সংশোধন করিলে বিশেষ উৎকর্ষ লাভ করে। যাঁহারা সাময়িক সাহিত্যের কার্য্যে ব্রতী, তাঁহাদের পক্ষে এই নিয়ম রক্ষাটি ঘটিয়া উঠে না। এজন্য সাময়িক সাহিত্য, লেখকের পক্ষে অবনতিকর।

৬। যে বিষয়ে যাহার অধিকার নাই, সে বিষয়ে তাহার হস্তক্ষেপ অকর্ত্তব্য। এটি সোজা কথা কিন্তু সাময়িক সাহিত্যতে এ নিয়মটি রক্ষিত হয় না।

৭। বিদ্যা প্রকাশের চেষ্টা করিবেন না। বিদ্যা থাকিলে, তাহা আপনিই প্রকাশ পায়, চেষ্টা করিতে হয় না। বিদ্যা প্রকাশের চেষ্টা পাঠকের অতিশয় বিরক্তিকর, এবং রচনার পারিপাট্যের বিশেষ হানিজনক। এখনকার প্রবন্ধে ইংরাজি, সংস্কৃত, ফরাশি, জর্ম্মান্, কোটেশন্ বড় বেশী দেখিতে পাই। যে ভাষা আপনি জানেন না, পরের গ্রন্থের সাহায্যে সে ভাষা হইতে কদাচ উদ্ধৃত করিবেন না।

৮। অলঙ্কার-প্রয়োগ বা রসিকতার জন্য চেষ্টিত হইবেন না। স্থানে স্থানে অলঙ্কার বা ব্যঙ্গের প্রয়োজন হয় বটে; লেখকের ভাণ্ডারে এ সামগ্রী থাকিলে, প্রয়োজন মতে আপনিই আসিয়া পৌঁছিবে—ভাণ্ডারে না থাকিলে মাথা কুটিলেও আসিবে না। অসময়ে বা শূন্য ভাণ্ডারে অলঙ্কার প্রয়োগের বা রসিকতার চেষ্টার মত কদর্য্য আর কিছুই নাই।

৯। যে স্থানে অলঙ্কার বা ব্যঙ্গ বড় সুন্দর বলিয়া বোধ হইবে, সেই স্থানটি কাটিয়া দিবে, এটি প্রাচীন বিধি। আমি সে কথা বলি না। কিন্তু আমার পরামর্শ এই যে, সে স্থানটি বন্ধুবর্গকে পুনঃ পুনঃ পড়িয়া শুনাইবে। যদি ভাল না হইয়া থাকে, তবে দুই চারি বার পড়িলে লেখকের নিজেরই আর উহা ভাল লাগিবে না—বন্ধুবর্গের নিকট পড়িতে লজ্জা করিবে। তখন উহা কাটিয়া দিবে।

১০। সকল অলঙ্কারের শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার সরলতা। যিনি সোজা কথায় আপনার মনের ভাব সহজে পাঠককে বুঝাইতে পারেন, তিনিই শ্রেষ্ঠ লেখক। কেন না, লেখার উদ্দেশ্য পাঠককে বুঝুন।

১১। কাহারও অনুকরণ করিও না। অনুকরণে দোষগুলি অনুকৃত হয়, গুণগুলি হয় না। অমুক ইংরাজি বা সংস্কৃত বা বাঙ্গালা লেখক এইরূপ লিখিয়াছেন, আমিও এরূপ লিখিব, এ কথা কদাপি মনে স্থান দিও না।

১২। যে কথার প্রমাণ দিতে পারিবে না, তাহা লিখিও না। প্রমাণগুলি প্রযুক্ত করা সকল সময়ে প্রয়োজন হয় না, কিন্তু হাতে থাকা চাই।

বাঙ্গালা সাহিত্য, বাঙ্গালার ভরসা। এই নিয়মগুলি বাঙ্গালা লেখকদিগের দ্বারা রক্ষিত হইলে, বাঙ্গালা সাহিত্যের উন্নতি বেগে হইতে থাকিবে।

 

(প্রচার, ১২৯১, মাঘ)

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s