হিন্দুধর্মের স্বরূপ-সন্ধানঃ অষ্টম পর্ব

(সপ্তম পর্ব এখানে)

১৫. এক হিন্দুধর্মের আধারে এক দিকে যেমনি বহুবিচিত্র পথে মানুষ জীবজগতের রহস্য নির্ণয় ও ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে, তেমনি অন্য দিকে সময়ে সময়ে এই বিচিত্র পথদের মধ্যে সমন্বয় করার চেষ্টাও হিন্দু ধর্মকারদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। হিন্দুধর্মের এরূপ সমন্বয়-প্রচেষ্টার সর্বোৎকৃষ্ট ফলাফল নিঃসন্দেহে শ্রীমদভগবদগীতা, সংক্ষেপে গীতা।

গীতা মূলতঃ হিন্দু মহাকাব্য মহাভারতে প্রক্ষিপ্ত একটি ক্ষুদ্র অংশবিশেষ, যাকে পরবর্তীতে স্বতন্ত্র ধর্মগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত করা হয়েছে। কৌরব ও পান্ডব ভাইদের মধ্যে রাজ্যশাসনের অধিকার নিয়ে সংঘটিত হওয়া কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের অনতিপূর্বে যুদ্ধক্ষেত্রের বিপক্ষ শিবিরে নিজের পরমাত্মীয়, বন্ধু ও সুহৃদদের দেখে পান্ডবদের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা অর্জুনের মনে এক বিষদাপন্ন সংশয়ের জন্ম হয়। প্রশ্ন আসে, যে যুদ্ধে নিজের পরমাত্মীয়দের বধ করতে হবে, সে যুদ্ধ করে কী লাভ! এ যুদ্ধ কি একান্তই ধর্মবিরুদ্ধ নয়?

অর্জুনের এ সংশয়ভাব দূর করে তাকে আবার যুদ্ধে প্রবৃত্ত করার জন্য তার রথের সারথি শ্রীকৃষ্ণ যুদ্ধক্ষেত্রেই অর্জুনকে এক অভূতপূর্ব ধর্মব্যাখ্যা শোনান। অভূতপূর্ব, কারণ এ সংক্ষিপ্ত ধর্মব্যাখ্যায় শ্রীকৃষ্ণের উক্তির মাধ্যমে গীতাকার হিন্দুধর্মের বিভিন্ন মত ও পথ হতে মূলভাব নিয়ে এদেরকে সমন্বয় করে ধর্মের সম্পূর্ণ এক নতুন তত্ত্ব ও ভাষ্য নির্মাণ করেন। এই অভূতপূর্ব ধর্মতত্ত্বের প্রভাব পরবর্তীতে এতটাই অনতিক্রম্য হয়ে দাঁড়ায় যে, তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক আচার-আচারণগত বিষয়ে বহুদূরবর্তী হিন্দুরাও এই একটি গ্রন্থের উপর তাদের আত্যন্তিক শ্রদ্ধা-ভক্তি রাখতে বাধ্য হন। এ কথা বললে মোটেই অত্যূক্তি হয় না যে, যদি কোন একক গ্রন্থ বিভিন্ন মত ও পথাবলম্বী হিন্দুদের মধ্যে কোন যোগসূত্রের সন্ধান দিতে পারে, তাহলে গীতাই নিঃসন্দেহে সেই গ্রন্থ। এছাড়া গীতা পরবর্তী হিন্দু তাত্ত্বিক/ দার্শনিকরা যেমনি গীতার তত্ত্ব/ ব্যাখ্যার দ্বারা আমূল প্রভাবিত হয়েছেন, তেমনি সাধারণ হিন্দুও গীতার তত্ত্বকে তাদের নিজের জীবনের সাথে মিশিয়ে নিতে পেরেছেন। সে অর্থে গীতাই প্রথম হিন্দু ধর্মগ্রন্থ, যা সর্বস্তরের ও সর্বকালের হিন্দু গ্রহণ করতে পেরেছ। প্রসঙ্গতই প্রশ্ন আসে, বহুবিচিত্র ও অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরবিরুদ্ধ বিভিন্ন ধর্মমতের এ সমন্বয় সম্ভব হলো কী উপায়ে? গীতার তত্ত্বে প্রবেশ করার পূর্বে এ প্রশ্নের একটা সদুত্তরের সন্ধান আবশ্যক।
এ প্রবন্ধের শুরুর দিকে আমরা বলেছিলাম, হিন্দুধর্মের ইতিহাস বুৎপত্তিগতভাবে সদগুণনিরপেক্ষ মনুষ্যত্ব সন্ধানের ইতিহাস। মনুষ্যত্বের সন্ধান করতে গিয়ে হিন্দুধর্ম বিভিন্ন মত ও পথ ধরে এগিয়েছে সত্যি, কিন্তু, এই বিচিত্রিতার মধ্যেও হিন্দুধর্মের মধ্যে একটা অব্যক্ত অন্তর্নিহিত ঐক্য বরাবরই দেখতে পাওয়া যায়, যে ঐক্যের প্রভাবে সব মত ও পথের মাধ্যমে প্রাপ্ত সত্যকেই স্বীকার করে নেওয়া হয়। অর্থাৎ, যে যেভাবে এই জগতসংসারের সত্যকে দেখছে তার জন্য সেটাই সত্য, সেটাই ধর্ম। হিন্দু দার্শনিকরা অবশ্য নিজেদের দর্শনমতকে শ্রেষ্ঠ ও অন্য দার্শনিক মতকে নিকৃষ্ট হিসেবে প্রমাণ করার আত্যন্তিক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দার্শনিকদের এই প্রচেষ্টা দর্শনের আওতাতেই সীমাবদ্ধ ছিলো। এ কারণে পৃথিবীর অন্যান্য জায়গার মতো ধর্মমতনির্ভর যুদ্ধ বা ক্রুসেড ভারতবর্ষে কখনও হয়েছে বলে জানা যায় না। শুধু ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতার মধ্যেই এই বৈশিষ্ট্য সীমাবদ্ধ নয়; এমনকি দার্শনিকরাও বিভিন্ন দর্শনের আন্তঃসমন্বয় করার মাধ্যমে ‘বহুর মধ্যে এক’ মূলনীতির সম্প্রসারণ করার চেষ্টা করেছেন।

বিশেষজ্ঞরা গীতার রচনার কালপর্ব নির্ধারণ করেছেন খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ হতে খ্রিস্টপূর্ব ২০০ সালের মাঝামাঝি কোন সময়ে। তত দিনে প্রধান সব উপনিষদ লিখিত হয়েছে; ভারতের প্রধান সব দর্শনশাস্ত্রের বিকাশও তত দিনে সম্পূর্ণ; জৈন ও বৌদ্ধধর্ম প্রতিষ্ঠিত; সর্বোপরি, পুরাণসাহিত্যের মাধ্যমে ভক্তিনির্ভর লৌকিক হিন্দুধর্মের গোড়াপত্তনও তত দিনে হয়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটেই প্রায় সকল দর্শন ও ধর্ম মত থেকে সার সংগ্রহ করে সর্ব্বতত্ত্বের সমন্বয়ের দুঃসাধ্য প্রচেষ্টাই পরিণতি লাভ করলো গীতার তত্ত্বে। একটু আগেই বলা হয়েছে, হিন্দু তাত্ত্বিক-দার্শনিকদের মধ্যে বিচিত্র মত ও পথকে সমন্বয় করার প্রচেষ্টা প্রাচীন কাল থেকেই লক্ষ্য করা গেছে; এরই ধারাবাহিকতায় গীতাকে এই সম্মিলিত প্রচেষ্টারই চূড়ান্ত ও সর্বোৎকৃষ্ট পরিণতি বলা যেতে পারে। শুধু সর্ব্বতত্ত্বের সমন্বয় প্রচেষ্টাই নয়, গীতাকে এমনকি বিবেচনা করা যেতে পারে সর্ব্বতত্ত্বের ও পথের অনুমোদক হিসেবেও; কারণ গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে বলতে শুনি,

“যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে
তাংস্থথৈব ভজাম্যহম্।
মম বর্ত্মানুবর্তন্তে
মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ।“

অর্থাৎ, “যে আমাকে যেভাবে উপাসনা করে, আমি তাকে সেভাবেই তুষ্ট করি। মনুষ্যগণ যে পথই অনুসরণ করুক না কেন, সকল পথেই আমাতে পৌছাতে পারে।“

এভাবে সকল পথের অনুমোদন দেওয়ার মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণরূপী ভগবান গীতাকে সর্ব মত ও পথের দার্শনিক হতে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন।

গীতার মূল তত্ত্ব ব্যাখ্যার পূর্বে একটু ভূমিকা করে নিতে হয়। মনে রাখতে হবে, গীতা পরবর্তী সময়ে এ গ্রন্থই মতপথনির্বিশেষে প্রায় সকল হিন্দুর প্রধান ধর্মগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু যেহেতু হিন্দুধর্মের আওতায় অসংখ্য মত ও পথ বিদ্যমান, সেহেতু গীতার তত্ত্বব্যাখ্যায়ও অসংখ্য ভিন্নতা দেখতে পাওয়া যায়। শঙ্করাচার্য্য হতে শুরু করে বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ, গান্ধী এরা প্রত্যেকে প্রায়ই গীতার এক শ্লোকেরই বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। গীতার তত্ত্বের বিস্তৃত ব্যাখ্যা তাই অত্যন্ত দুরূহ; এ কারণে এ প্রবন্ধে সংক্ষেপে গীতার একটি মূলতত্ত্ব, যাকে স্বীকার করে না নিলে গীতাকেই অস্বীকার করা হয় বলা যায়, সেই তত্ত্বের মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকবে।

মানুষের মুক্তির উপায় কী, হিন্দুধর্মের এই চিরন্তন প্রশ্নের গীতাকৃত উত্তরকেই গীতার মূলতত্ত্ব বলা যায়। গীতার মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ মুক্তির তিনটি পথ নির্দিষ্ট করেছেন: জ্ঞানযোগ, কর্মযোগ, ভক্তিযোগ। এই ত্রিবিধ উপায় কিন্তু একই উদ্দেশ্যে পরিণতি পায়। এদের দেখা যেতে পারে একই গন্তব্যে পৌছাতে তিনটি বিকল্প পথ হিসেবে; পথ যেটাই গ্রহণ করি না কেন, শেষতঃ এই পথরা একই গন্তব্যেই পৌছাবে।

প্রথম উপায় জ্ঞানযোগ নির্দিষ্ট করা জ্ঞান সাধানার দ্বারা যারা মুক্তি লাভ করতে চায় তাদের জন্য। অথ্যাৎ দার্শনিক/ চিন্তকদের পথই জ্ঞানযোগ। এই জ্ঞানযোগের মাধ্যমেই বেদান্তিক বা সাংখ্যকাররা ব্রহ্মের অথবা প্রকৃতি/ পুরুষের স্বরূপ জেনে মুক্তি লাভ করতে পারেন।

অবশ্য গীতার অসাধারণত্ব নিঃসন্দেহে কর্মযোগ সম্পর্কিত আলোচনায়। কর্মযোগ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গীতাকার সম্পূর্ণ নতুন এক তত্ত্বের ধারণা দেন, যাকে পরবর্তীতে অভিহিত করা হয়েছে নিষ্কাম কর্ম হিসেবে। গীতাকার বলেন, মানুষের সব প্রবৃত্তি ও সংসারের সকল দায়িত্ব থেকে দূরে থেকে যে সন্ন্যাসী বিজনে একান্ত বৈরাগ্যের সাধন করেন, তিনি অবশ্যই মুক্তি লাভ করতে পারেন; তবে তার থেকেও বড় সন্ন্যাসী সে, যে সংসারে থেকেও সকল প্রবৃত্তির উপর নিজের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করতে পারে। তাই যদিও শ্রীকৃষ্ণ সংসারত্যাগী সন্ন্যাসীর পথকে অনুমোদন দিলেন, তথাপি অর্জুনকে তিনি কর্ম ত্যাগ করার পরিবর্তে সকল কর্ম সম্পাদন করার উপদেশই দিলেন। কিন্তু কর্ম থেকেই যেহেতু যাবতীয় সব দুঃখভোগের উৎপত্তি, সেহেতু সকল কর্মযোগীকে সকল কর্ম যথাযথভাবে সম্পাদন করার পাশাপাশি কর্মের ফল সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন থাকার পরামর্শও দেওয়া হলো। এভাবে ফলের আকাঙ্খা সম্পূর্ণ ত্যাগ করে পালনীয় সব কর্ম সম্পাদনের দর্শনকেই বলা হয় নিষ্কাম কর্ম। গীতাকারের মতে, নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে মানুষ যেমনি পরকালে শান্তি পায়, তেমনি ইহকালের শান্তিও নিশ্চিত করে। আমরা একটু চিন্তা করলেই খেয়াল করবো, ফলাকাঙ্খা মানুষের অশান্তির একটি প্রধান কারণ। আমরা যেকোন কাজে ব্যাপৃত হওয়ার সময় এই কাজের মাধ্যমে আমি কী ফল পাবো তার কথা চিন্তা করি এবং আশানুরূপ ফল না পেলে অসুখী হই। তাই গীতাকার কর্মযোগের মাধ্যমে এমন একটি পথের নির্দেশ দিলেন, যে পথে পালনীয় কর্মে কোন অবহেলা না করলেও এর ফল সম্পর্কে আমাদের সম্পূর্ণ উদাসীন থাকতে হবে। এ পথ মূলতঃ দার্শনিক ঔদাসীন্যের পথ। একমাত্র দার্শনিক ঔদাসীন্যের দ্বারাই কাজের থেকে ফলকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার ক্ষমতা অর্জন করা যেতে পারে। তাই বলা যায়, কর্মযোগের ধারণার মাধ্যমে গীতাকার হিন্দুকে মূলতঃ দার্শনিক ঔদাসীন্য অর্জন করার উপদেশই দিয়েছেন।

গীতার তৃতীয় নির্দেশিত মুক্তির পথ ভক্তি। জ্ঞানযোগী বা যথার্থ কর্মযোগী হওয়া যাদের জন্য দুরূহ, তারা তাদের চিত্ত ভগবানরূপী শ্রীকৃষ্ণতে সম্পূর্ণ সমর্পণ করেও মুক্তি লাভ করতে পারেন। এ প্রসঙ্গে গীতাকার এও বলেন, বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন ইষ্টের আরাধনা বিভিন্ন ভাবে করলেও সব আরাধনাই শেষতঃ শ্রীকৃষ্ণের কাছেই পৌছায়। এভাবে ভক্তিযোগ প্রচারের মাধ্যমে গীতাকার সাধারণ মানুষের উপাসনার পথকেও অনুমোদন দিলেন।

মুক্তির এই ত্রিবিধ উপায় নির্দেশিত হলেও গীতায় আবার এই তিন পথের সমন্বয়ও করা হয়েছে। যথার্থ জ্ঞানী কর্মযোগী, কারণ তিনি জানেন অকর্ম থেকে নিষ্কাম কর্ম শ্রেয়তর। আবার যেহেতু তিনি জ্ঞানের মাধ্যমে ব্রহ্মকে জেনেছেন, সেহেতু ব্রহ্মের উপরই তার চিত্ত একান্তভাবে সমর্পিত। এ কারণে যিনি জ্ঞানযোগী, তিনি একই সাথে কর্মযোগী এবং ভক্তিযোগীও বটে।

(পরবর্তী পর্ব উপসংহার (১ম অংশ) এখানে)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s