হিন্দুধর্মের স্বরূপ-সন্ধানঃ ষষ্ঠ পর্ব

(পঞ্চম পর্ব এখানে)

১১. এই প্রবন্ধে পূর্বে মন্তব্য করা হয়েছিলো, ভারতবর্ষের প্রচলিত সমস্ত ধর্ম ও দর্শন মূলতঃ আর্যদের এই ভূখন্ডে আগমনের ফলাফল। গুরু-শিষ্য পরম্পরাগত যে জ্ঞানচর্চার ইতিহাসের দিকে এ প্রবন্ধে আমাদের মূল মনোযোগ, সে ইতিহাস সম্পর্কে এই উক্তিকে যথাযথ হিসেবে মানা চলে। কিন্তু আর্যদের ভারতে আগমনের পূর্বেও এই ভূখন্ডে উন্নত কৃষিজীবী সভ্যতার অস্তিত্ব ছিলো। প্রত্নতাত্ত্বিকদের বিভিন্ন গবেষণা থেকে ধারণা করা হয়, সেই প্রাকবৈদিক অনার্য সভ্যতার অনেক ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-আচরণকে পরবর্তীতে বৈদিক সাহিত্যে ও ধর্মে অন্তভূর্ক্ত করে নেওয়া হয়েছিলো। যেমন অনেকেই ধারণা করেন, ঋগবেদে উল্লেখিত উষা মূলতঃ অনার্যদেরই দেবী। বেদ ও তৎপরবর্তী ভারতীয় ধর্ম-দর্শনে অনার্য প্রভাব ঠিক কতটুকু তা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হওয়া প্রায় দুঃসাধ্য হলেও সামগ্রিক হিন্দুধর্মে অনার্য প্রভাবের উপস্থিতি সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই, তা যত কম বা বেশিই হোক না কেন।

সাংখ্য দর্শনের আলোচনা করতে গিয়ে হিন্দুধর্মে অনার্য প্রভাবের অবতারণা করাকে ধান ভানতে শিবের গীত মনে হতে পারে। কিন্তু, অনেক ঐতিহাসিকের মতে সাংখ্য দর্শনের উপর প্রাকবৈদিক অনার্য সভ্যতার প্রভাব সুস্পষ্ট। অনেকে এতোটা নিঃসন্দেহ না হলেও এই প্রভাবকে পুরোপুরি অস্বীকারও করেন না। তাই সাংখ্য দর্শন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রাসঙ্গিকভাবেই হিন্দুধর্মের উপর অনার্য প্রভাবের বিষয়টি চলে আসে। তবে ঠিক কীভাবে অনার্য ধর্ম বিশ্বাস সাংখ্য দর্শনকে প্রভাবিত করতে পারে তা বোঝার আগে সাংখ্য দর্শনের আলোচনা সেরে নেওয়া জরুরী।

সরাসরি সাংখ্য দর্শনে ঢোকার আগে আমরা এখানে আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের জনক রেনে দেকার্ত এর অধিতত্ত্ব নিয়ে একটু আলোচনা করবো। এর উদ্দেশ্য ক্রমশই স্পষ্ট হবে। দেকার্ত এর মতে, আমাদের অস্তিত্বকে দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়; শারীরিক ও মানসিক। ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে আমরা যার সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারি তাই শারীরিক। অথবা অন্যভাবে বলতে গেলে, যার শরীর আছে তাই শারীরিক। কিন্তু শরীরের বাইরেও মানুষের অভ্যন্তরে মন বা আত্মা (soul) এর অস্তিত্ব আছে, যা ইন্দ্রিয় দিয়ে উপলব্ধি করা যায় না, কিন্তু যার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। যেমন আমাদের আবেগ, অনুভূতি, চিন্তা, কল্পনা এদের কোন শারীরিক সত্তা নেই, কিন্তু এদের উপস্থিতি সম্পর্কে আমরা নিঃসন্দেহ। অস্তিত্বকে এভাবে দুই ভাগে বিভক্ত করাকে দর্শনের ভাষায় দ্বৈতবাদ বলা হয়, যার একটি রূপ আমরা ইতিমধ্যে বেদান্তের দ্বৈত দর্শনে দেখেছি।

আধুনিক বিজ্ঞান দেকার্ত এর এই দ্বৈতবাদকে স্বীকার করে না। বিজ্ঞানে সর্বশেষ উপলব্ধি অনুযায়ী মন বলতে আলাদা কোন বস্তুর অস্তিত্ব নেই। দেকার্ত মন বলতে যা বুঝিয়েছেন, তাকে মস্তিষ্কের বিভিন্ন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমেই ব্যাখ্যা করা যায়। মূলতঃ আমাদের যত আবেগ, অনুভূতি, চিন্তা, কল্পনা, তার সবকিছুই মস্তিষ্কের বিভিন্ন ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার ফলাফল। এ কারণে আধুনিক বিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত, মানুষের সমস্ত মানসিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার শারীরতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা থাকায় মনকে শরীরের বাইরে ভিন্ন কিছু হিসেবে স্বীকার করা নিষ্প্রয়োজন।

আমাদের আলোচ্য সাংখ্য দর্শনের অধিতত্ত্বও দ্বৈতবাদী। কিন্তু এই দ্বিত্ব শরীর ও মনের মধ্যে নয়। সাংখ্য শরীর ও মনের জায়গায় অস্তিত্বকে ভাগ করেছে বিচিত্র দুই উপাদানে; এদের নাম প্রকৃতি ও পুরুষ। প্রকৃতি ও পুরুষ এর কোন ইংরেজী অনুবাদ সম্ভব নয়, কারণ এই ধরণের দ্বৈতবাদের কোন নিদর্শন পাশ্চাত্য চিন্তার ইতিহাসে পাওয়া যায় না। এদেরকে পুরোপুরি অনুধাবন করতে হলে আমাদের কল্পনার সীমাকে তাই একটু প্রসারিত করে নেওয়া প্রয়োজন, যেহেতু আমাদের চিন্তার ধারাক্রম পাশ্চাত্য চিন্তা ও ভাষার কাঠামো দ্বারা গঠিত ও নিয়ন্ত্রিত।

আমাদের শরীর ও মন এই দুই মিলিয়েই প্রকৃতি। কীভাবে শরীর ও মন দুইটিকেই প্রকৃতির মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করা যায়, তা নিয়ে সাংখ্য দর্শনে বিশদ বিবরণ আছে। আমরা শুধু সংক্ষেপে এর আলোচনা করবো।

আমাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ইন্দ্রিয়ানুভূতির মাধ্যমে আমরা বাইরের পৃথিবীর সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ করি। বাইরের পৃথিবী ও আমাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ- এই দুইই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, অর্থাৎ শারীরিক। এতটুকু পর্যন্ত সাংখ্যের প্রকৃতি সম্পূর্ণ শারীরিক। কিন্তু এই দুইয়ের মধ্যে যোগাযোগের যে উপায়, অর্থাৎ বিভিন্ন ইন্দ্রিয় (শ্রবণ, দর্শন ইত্যাদি), সাংখ্যমতে এরাও প্রকৃতির অংশ। এভাবে সাংখ্যে প্রকৃতির ধারণা শরীর থেকে মনে প্রসারিত হয়ে যায়। ইন্দ্রিয়ানুভূতির মাধ্যমে বাইরের পৃথিবীর সাথে আমাদের যোগাযোগ ঘটে, যার ফলে বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বা বুদ্ধি জন্মে। এভাবে জ্ঞানলাভের মাধ্যমে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেও আমাদের জ্ঞান লাভ হয়, অর্থাৎ আমাদের আত্মজ্ঞান (অহংকার; self knowledge) হয়। এভাবে শরীর থেকে শুরু করে যাবতীয় মানসিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সবকিছুকেই সাংখ্য প্রকৃতির মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করে নেয়।

কিন্তু সাংখ্যের মতে এই সকল শারীরিক ও মানসিক অস্তিত্ব ছাড়াও সকল জীবের মধ্যে আরেকটি মৌলিক প্রকৃতি নিরপেক্ষ বস্তু আছে, যাকে সাংখ্য বলেছে পুরুষ। এই পুরুষকে বলা যায় সচেতনতার মূল, যার কারণে জীব, জড় হতে সম্পূর্ণ পৃথক। অর্থাৎ যে অজ্ঞাত বস্তুর প্রভাবে আমরা সচেতন জীব, অচেতন জড় নেই, তাকেই পুরুষ বলা যায়। আমরা আমাদের যাবতীয় সকল শারীরিক ও মানসিক কাজে প্রকৃতির অস্তিত্বকেই দেখি, কিন্তু পুরুষই সেই কারণ, যার জন্য প্রকৃতির এত আয়োজন। সমস্ত শারীরিক ও মানসিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সম্পন্ন করার মাধ্যমে প্রকৃতি পুরুষকে, অর্থাৎ সচেতনতার মূলকে, টিকিয়ে রাখে।

অপরাপর সকল হিন্দু ধর্ম-দর্শনের মত সাংখ্যেও মুক্তির উপায় নির্দিষ্ট করা আছে। মুক্তি সন্ধানকারী যেকোন মানুষকে প্রথমেই তার পুরুষের সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে হবে। অর্থাৎ, তাকে অনুধাবন করতে হবে শারীরিক ও মানসিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সম্পাদনকারী প্রকৃতির মধ্যেই তার অস্তিত্ব সীমাবদ্ধ নয়, বরং তার অস্তিত্বের মূলে আছে তার সচেতনতার মূল তথা পুরুষ। এই পুরুষ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ সম্পন্ন হওয়ার পরই কেবল তার পক্ষে, বা তার পুরুষের পক্ষে, সম্ভব প্রকৃতির বন্ধন হতে মুক্তি লাভ করা।

দেখা যাচ্ছে সাংখ্য দর্শনকে বিজ্ঞানবিরোধী বলা কষ্টসাধ্য। এক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখা প্রযোজন, কোন তত্ত্ব বিজ্ঞানবিরোধী না বলার মানে এই নয় যে, এ তত্ত্ব বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত। আধুনিক বিজ্ঞান শরীর ও মনের পার্থক্য স্বীকার করে না, তাই দেকার্তের দ্বৈতবাদ বিজ্ঞানবিরোধী। কিন্তু শরীর ও মনের অতিরিক্ত পুরুষ এর কল্পনা বিজ্ঞানবিরোধী না, যদিও বিজ্ঞান দ্বারা অপ্রমাণিত।

প্রায় অবিশ্বাস্য হলেও এটি সত্য যে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে সাংখ্য দার্শনিকরা যে জায়গায় থেমেছেন, আধুনিক বিজ্ঞানও একদম সেই জায়গাতেই থেমে আছে। সচেতনতার মূলকেই (পুরুষ) সাংখ্য জীবের মূল ভিত্তি হিসেবে কল্পনা করেছে; আধুনিক বিজ্ঞানের পক্ষে এখনও এই সচেতনতাকে অতিক্রম করে যাওয়া সম্ভব হয়নি। মানসিক সকল ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে বিজ্ঞান এখন সুস্পষ্টভাবেই ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু ঠিক কীসের উপস্থিতিতে জীব জড় হতে পৃথক সে বিষয়ে, অর্থাৎ সচেতন জীবের সাথে অচেতন জড়ের পার্থক্য বা চেতনা বা সচেতনতা বলতে ঠিক কী নির্দেশ করা যায়, সে বিষয়ে বিজ্ঞানের স্পষ্ট কোন তত্ত্ব নেই। আদৌ সচেতনতার প্রশ্নটি বৈজ্ঞানিকভাবে নিরসন করা সম্ভব কী না তা নিয়েও এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অবশ্যই আমাদের আলোচনার উপসংহার হিসেবে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি না যে, সাংখ্য দর্শন বৈজ্ঞানিক। আধুনিক অর্থে বিজ্ঞান বলতে আমরা যা বুঝি, তার কোন অস্তিত্ব প্রাচীন ভারতে ছিলো না; তাই সাংখ্য দার্শনিকরা কোন বৈজ্ঞানিক উপায়ে তাদের সিদ্ধান্তে পৌছাননি। তাছাড়া, সাংখ্যের উপসংহারকে বিজ্ঞানের মাধ্যমে প্রমাণিত করাও সম্ভব হয়নি। বৈজ্ঞানিক কলাকৌশলের সহায়তা ছাড়া এরূপ সিদ্ধান্তে পৌছানো সম্ভব হয়েছিলো কী উপায়ে তা নিয়ে বলতে গেলে অবশ্য সামগ্রিক ভারতীয় দর্শনের একটি বিশেষ উৎকর্ষের কথা বলতে হয়। প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিকরা তাদের সমস্ত জ্ঞান পেয়েছিলেন প্রকৃতির কাছে; অর্থাৎ প্রকৃতিই তাদের সকল জ্ঞানের উৎস। প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ ও তা থেকে শুধু ধ্যান বা চিন্তার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌছার এ প্রক্রিয়া এখনও এই বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগে আমাদের বিস্ময়ের উদ্রেক করে। উপরন্তু প্রকৃতির সাথে মানুষের আদিম নিবিড় সম্বন্ধ ও তার মাধ্যমে চরম দার্শনিক তত্ত্বে উপনীত হওয়ার অপার সম্ভাবনার সূত্রও নির্দেশ করে।

১২. প্রাকবৈদিক অনার্য সভ্যতায় এমন কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া যায়, যার থেকে ধারণা করা হয় আর্যদের এদেশে আগমনের পূর্বেই এই উপমহাদেশে শক্তির উপাসনা প্রচলিত ছিলো। শক্তির উপাসনা এখনও হিন্দুধর্মে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ধর্মীয় আচরণ। এই শক্তি-উপাসনার একটি দার্শনিক ভিত্তি আছে, যা দ্বৈতবাদী এবং যার সাথে সাংখ্য দর্শনের দার্শনিক মিল পাওয়া সম্ভব। শক্তির এরূপ উপাসনার দার্শনিক তত্ত্বকে বলা হয় তন্ত্র।

সাংখ্যের প্রকৃতিকে তন্ত্রে নারীমূর্তি হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। এই নারীমূর্তিস্বরূপ প্রকৃতিই অস্তিত্বশীল পৃথিবী, যাকে বলা হচ্ছে শক্তি। শক্তি প্রকৃতিতে বিভিন্ন ভাবে প্রকাশিত হয়, যাদেরকে কল্পনা করা হয় বিভিন্ন দেবী হিসেবে, যেমন দুর্গা, কালী, জগদ্ধাত্রী, পার্বতী প্রভৃতি। কিন্তু এই শক্তিরূপ প্রকৃতি নিজের মাধ্যমে পুরুষকেই প্রকাশিত করে, যাকে তন্ত্রে বলা হয় শিব। এই শিব/শক্তিকে পুরুষ/প্রকৃতিরই একটি ভিন্নতর ধর্মীয় প্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তন্ত্রমতে এই শক্তি বা শিবের একান্ত উপাসনার মাধ্যমে এদের প্রকৃত স্বরূপ অনুধাবন ও এদের মধ্যে নিজেকে লীন করে দেওয়ার মাধ্যমেই জীবদেহের মুক্তি সম্ভব বলে মনে করা হয়।

সাংখ্যের সাথে শক্তি উপাসনার তাত্ত্বিক সম্পর্ককে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। তবে এক্ষণে গুরুতর প্রশ্ন, সাংখ্য দর্শন কি প্রাকবৈদিক অনার্য শক্তি উপাসনা থেকেই জন্মলাভ করেছে কি না?

আগেই বলা হয়েছে সিন্ধু অনার্য সভ্যতায় শক্তি উপাসনার নিদর্শন পাওয়া যায়। তবে এই নিদর্শন থেকে সে সময়ে এই উপাসনার দাশনিক ভিত্তি কী ছিলো, সে সম্পর্কে কোন নিশ্চিত উপসংহারে পৌছানো সম্ভব নয়। তাই এই প্রাকবৈদিক শক্তি উপাসনা হতেই সাংখ্য তার দার্শনিক তত্ত্বের ভিত্তি পেয়েছে, এরূপ সিদ্ধান্ত করার কোন যৌক্তিক প্রয়োজন হয় না। তদুপরি সাম্প্রতিককালের অনেক গবেষক দেখিয়েছেন, সাংখ্য দর্শনের মূল বেদ ও উপনিষদের মধ্যেই পাওয়া যায়, যা থেকে তাত্ত্বিকভাবে সাংখ্য দর্শনের মূল নীতিতে পৌছানো সম্ভব। অর্থাৎ, বেদ ও উপনিষদের মধ্যেই এমন অনেক সূত্র আছে, যা থেকে তাত্ত্বিকভাবে সাংখ্য দর্শনের মূলনীতিতে পৌছানো সম্ভব। তাই সাংখ্য দর্শনের উপর প্রাকবৈদিক অনার্য সভ্যতার সরাসরি প্রভাব কল্পনা না করলেও চলে।

তবে ভারতীয় ধর্ম-দর্শনের বিভিন্ন ধারা, মত ও তত্ত্ব পরস্পর হতে বিভিন্ন হলেও এদের মধ্যে প্রচুর আন্তঃসম্পর্ক আছে। এ কথা অন্ততঃ সন্দেহাতীত যে, প্রাকবৈদিক অনার্য সভ্যতার অনেক ধর্মীয় বিশ্বাস আচার আচরণ এখনও হিন্দুধর্মে প্রোথিত আছে।  যেহেতু সাংখ্য ও তন্ত্রের মধ্যে সম্পর্ক অতি নিকট এবং যেহেতু প্রাকবৈদিক অনার্য সভ্যতায় শক্তি উপাসনার অনেক নিদর্শন পাওয়া যায়, সেহেতু  ইতিহাসের কোন পর্যায়ে প্রাকবৈদিক অনার্য বিশ্বাস বা দর্শন দ্বারা সাংখ্য দর্শনের প্রভাবিত হওয়া তাই একেবারেই অসম্ভব নয়।

১৩. সাংখ্য দর্শনের অধিতত্ত্ব পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এই দর্শনে একজন সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বর, বা বেদান্তমতে পরমাত্মা ব্রহ্মের ধারণা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। মূলতঃ সাংখ্য দর্শনের অধিতত্ত্বের ব্যাখ্যায় ঈশ্বরের অনুমান করার কোন প্রয়োজন হয় না; অনেক সাংখ্যকার এমনকি সৃষ্টিকর্তার ধারণাকে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে বাতিল করতেই চেয়েছেন।

অথচ সামগ্রিক ভারতীয় ধর্ম-দর্শনে অদ্বৈত বেদান্তের পর যে দর্শন সবচেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছে, তা সাংখ্য (এমনকি অনেকেই ধারণা করেন, গৌতম বুদ্ধ তার দার্শনিক প্রেরণা পেয়েছিলেন উপনিষদ ও সাংখ্য হতে)। তাহলে হিন্দু ধর্মের মূল হিসেবে ব্রহ্মকে আমরা স্বীকার করে নিলেও দেখা যাচ্ছে যে, অনেক হিন্দু দর্শন পরবর্তীতে ব্রহ্মের ধারণাকে সম্পূর্ণ বাতিল করেই এগিয়েছে। কিন্তু অপরাপর সকল হিন্দু বা ভারতীয় ধর্ম-দর্শনের মতোই সাংখ্যও জীবের মুক্তিলাভের বিষয়ে নিশ্চুপ থাকেনি।

(চলবে)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s