হিন্দুধর্মের স্বরূপ-সন্ধানঃ পঞ্চম পর্ব

(চতুর্থ পর্ব এখানে)

৯. ভারতবর্ষে জ্ঞানের সকল শাখাই ঐতিহাসিকভাবে ধর্মতত্ত্বের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলো। এর কারণ, জাগতিক এবং পারমার্থিক সবকিছুকেই ধর্মের আধারে এখানে বিবেচনা করা হোত। এর ফল হয়েছে দ্বিবিধ; একদিকে, সবকিছুকেই ধর্মের প্রেক্ষিতে চিন্তা করায় জ্ঞানের অনেক শাখাই এখানে একটা পর্যায় পর্যন্ত যাওয়ার পর নিশ্চল হয়ে থেমে গেছে, যে কারণে গণিত, জ্যোর্তিবিদ্যা, রসায়ন, বা চিকিৎসাবিদ্যা সব শাস্ত্রই এখানে বিকশিত হওয়া সত্ত্বেও পরিপূর্ণতার দিকে যেতে পারেনি; অন্যদিকে, জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে সর্বদাই ধর্ম থাকায় জ্ঞানের বিভিন্ন ও বিচিত্র শাখার মধ্যেও একটা সামগ্রিকতা বোধের সন্ধান পাওয়া গেছে।

অন্য সবকিছুর মতো ভারতের দর্শনও ভারতের ধর্মের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। ভারতীয় দর্শনের সূচনা মূলতঃ উপনিষদে, যা প্রধানত মূল ধমর্গ্রন্থ বেদেরই ব্যাখ্যা। পরবর্তীতে বিভিন্ন ধর্মতত্ত্ব থেকে দর্শনের বিভিন্ন ধারা যেমনিভাবে জন্ম লাভ করেছে, তেমনি তার বিপরীতভাবে অনেক প্রচলিত ধর্মমতও জন্ম লাভ করেছে বিভিন্ন দার্শনিক তত্ত্ব থেকে। এভাবে ভারতের ইতিহাস জুড়ে ধর্ম ও দর্শন পরস্পরকে নিয়ন্ত্রিত ও প্রভাবিত করে এসেছে। গুরু-শিষ্য কেন্দ্রিক পরম্পরাগত যে জ্ঞানচর্চার প্রতি এ প্রবন্ধে আমাদের মূল মনোযোগ, সেখানে ধর্ম ও দর্শন একের সাথে অপর মিলেমিশেই ছিলো। তাই হিন্দুধর্মকে বুঝতে হলে অবশ্যই ভারতীয় দর্শন সম্পর্কে আমাদের বিস্তারিত আলোচনার দরকার পড়ে।

বর্তমান প্রবন্ধের বিষয়গত সীমাবদ্ধতার কারণে হিন্দু দর্শনের বিশাল ও বিচিত্র জগত নিয়ে পূর্ণ আলোচনার সুযোগ এখানে নেই। কিন্তু হিন্দুধর্মের যে মূল স্বরূপের সূক্ষ সন্ধান আমরা পেয়েছি, তার তত্ত্ব ভালোভাবে আত্মস্থ করার জন্য অন্ততঃ কয়েকটি দার্শনিক ভিত্তি থেকে এই স্বরূপের মোকাবিলা করা জরুরী। এ পর্যায়ে সঙ্গত প্রশ্ন, হিন্দু ধর্ম-দর্শনের অসংখ্য প্রকার থাকতে কেন আমরা বেদান্ত, সাংখ্য ও পুরাণকেই বেছে নিচ্ছি।

এই আপাত দৈবচয়নের একমাত্র উদ্দেশ্য, হিন্দু ধর্ম-দর্শনের প্রকৃতিগত বিচিত্রতা/ বিভিন্নতাকে অনুধাবন করা। আমরা পূর্বেই বলেছি, হিন্দুধর্মের আদি মূল এক ও অদ্বিতীয় পরম ব্রহ্মের ধারণায়। এও বলেছি, পরবর্তী হিন্দু ধর্ম-দর্শন এতোই বিচিত্রপথগামী হয়ে গেছে যে, এই ব্রহ্মের ধারণাকেই অনেক দর্শন অস্বীকার করে এগিয়েছে। পড়ন্তু, এই ব্রহ্মের ধারণায় বিশ্বাসী দর্শনও বিচিত্র এবং বিভিন্ন পথে বহুদিকে চলে গেছে। ফলতঃ ব্রহ্মের ধারণাকে আরও সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য আমি এমন তিনটি পথ বেছে নিয়েছি, যারা একে অপর থেকে বহুদূরবর্তী, এবং যাদের মাধ্যমে হিন্দুধর্মের তাত্ত্বিক বিস্তৃতির একটা ধারণা লাভ করা যেতে পারে। অবশ্য প্রকারে বহুদূরবর্তী এই তত্ত্বদেরকেও পরবর্তীতে সংশ্লেষ করার মাধ্যমে এদের মধ্যকার ব্যবধান দূর করার চেষ্টা করা হয়েছে। এই চেষ্টা অবশ্য সমন্বয়ধর্মী হিন্দুধর্মের প্রায় সকল মত/তত্ত্বের ব্যাপারেই বলা যায়। সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ, বৌদ্ধধর্ম ও হিন্দুধর্মের পারস্পরিক প্রভাব ও এই দুই তত্ত্বের সমন্বয়। এমনকি তাত্ত্বিকভাবে বহুদূরবর্তী ইসলাম ধর্মের অনেক অংশকেও হিন্দুধর্ম আত্মীকৃত করে নিতে পেরেছে। বহুদিকমুখিনতার মাধ্যমে ঐক্যের সন্ধান লাভ করার প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে হিন্দুধর্মের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য।

আমাদের পূর্বের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মুক্তিলাভকে যেহেতু আমরা বলেছি হিন্দুধর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য, সেহেতু আমাদের বিবেচ্য তিনটি পথ অনুযায়ী মুক্তি লাভের উপায় সম্বন্ধেও আমাদের আলোচনা করতে হবে।

হিন্দুধর্মের সব মত ও তত্ত্বের মধ্যে বেদান্তকে নিঃসন্দেহে সর্বাধিক প্রভাবসৃষ্টিকারী তত্ত্ব বলা যায়। যেহেতু হিন্দুর আদি ধর্মগ্রন্থ বেদ থেকেই বেদান্তের দার্শনিক মূল গৃহীত, সেহেতু বৈদিক যুগ থেকেই বেদান্ত হিন্দুধর্মের একটি প্রধান দার্শনিক মত হিসেবে স্বীকৃত। বেদান্ততে ব্রহ্মের যে ধারণা বিবৃত হয়েছে, তাই মূলতঃ ব্রহ্মের আদি ও প্রাথমিক ধারণা।

অন্যদিকে, সাংখ্য দর্শনের মূলতত্ত্বে ব্রহ্মের ধারণাই অনুপস্থিত। সাংখ্য বৈদিক সাহিত্যের প্রধান ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই ধারাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে এক বিচিত্র পথে, যে পথের মধ্যে সম্ভবত প্রাকবৈদিক অনার্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির অনেক প্রভাব নিহিত রয়েছে। এই প্রবন্ধে এখনও পর্যন্ত অনালোচিত অথচ হিন্দুধর্মের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ, হিন্দুধর্মের উপর প্রাকবৈদিক অনার্য প্রভাব, এর বিষয়ে আলোচনা ছাড়া হিন্দুধর্মের উপর কোন আলোচনাই সম্পূর্ণ হওয়ার অধিকার রাখে না। সাংখ্য দর্শন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আবশ্যিকভাবেই এই প্রসঙ্গ এসে পড়বে।

শেষতঃ যে জাগতিক ও ব্যবহারিক মূর্তিপূজানির্ভর হিন্দুধর্মকে আমরা দেখি ও জানি, তার দার্শনিক মূল সম্পর্কে অবহিত না হলেও হিন্দুধর্ম সম্পর্কে আমাদের পরিচয় সম্পূর্ণ হতে পারে না। মূর্তিপূজার দার্শনিক মূল নিহিত রয়েছে পুরাণনির্ভর সাহিত্যে। পুরাণসাহিত্যের বিস্তারিত আলোচনা আমাদের উদ্দেশ্য নয়, আমাদের লক্ষ্য কেবল সমগ্র পুরাণসাহিত্যের মধ্যে ব্রহ্মনির্ভর একটি দার্শনিক তত্ত্বের সন্ধান লাভ।

১০. উপনিষদেরই আরেক নাম বেদান্ত; উপনিষদ থেকেই বেদান্ত দর্শনের সূচনা। বেদে বিবৃত ধর্মের তাত্ত্বিক ও দার্শনিক ব্যাখ্যা উপনিষদের আলোচ্য। সে অর্থে উপনিষদের দর্শন তথা বেদান্তকে আমরা বেদের দর্শনও বলতে পারি।

উপনিষদের মাধ্যমে সূচিত হলেও বেদান্ত দর্শন পরবর্তীতে দুইটি প্রধান ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়; একটি অদ্বৈতবাদ, অপরটি দ্বৈতবাদ। আমরা এখন এই দুই বেদান্ত মতে ব্রহ্মের স্বরূপ দেখার চেষ্টা করবো।

প্রকৃতিতে অস্তিত্বশীল সমস্ত প্রাণী, উদ্ভিদ, জড়বস্তু- সবকিছুই মূলে এক, যার নাম আত্মা। আর এই খন্ডিত আত্মাদের বৃহৎ অখন্ড মূল রূপই হল পরমাত্মা বা ব্রহ্ম- পূর্বে ব্রহ্মের স্বরূপ বিবৃত করতে গিয়ে এতটুকুতেই আমরা থেমেছিলাম। এই তত্ত্ব মূলতঃ উপনিষদেরই তত্ত্ব। কিন্তু জীবের অভ্যন্তরের আত্মা তথা জীবাত্মার সাথে পরমাত্মা বা ব্রহ্মের প্রকৃত সম্পর্ক উদঘাটন করতে গিয়ে বেদান্তিকরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যান।

অদ্বৈত বেদান্তবাদী বলেন, জীবাত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে মূলে কোন পার্থক্য নেই। আদিতে এক অভিন্ন অখন্ড পরমাত্মা খন্ডিত হয়ে বিভিন্ন রূপে অসংখ্য জীবাত্মায় বিভক্ত হয়ে যায়। এইবস জীবাত্মারা আসলে এক পরমাত্মা ব্রহ্মেরই ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ। অর্থাৎ, অদ্বৈত বেদান্তবাদীর মতে সকল জীবই মূলতঃ ব্রহ্মের অংশ। কিন্তু এই জীবেরা যে প্রকৃতিতে বাস করে, তা এই জীবদের আত্মতত্ত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভুলিয়ে রাখে। অদ্বৈত বেদান্তবাদীর মতে, প্রকৃতির পরম কোন অস্তিত্ব নেই; সমগ্র বিশ্বপ্রকৃতিই তার মতে মায়া-স্বরূপ। এই মায়ার বন্ধন ছিন্ন করে নিজের ও প্রকৃতির সম্পর্কে পরম সত্যে পৌছানো অত্যন্ত দুরূহ, কিন্তু অসম্ভব নয়। এই দর্শনমতে যখন কোন জীবাত্মা এই পরম সত্যে বা ব্রহ্মজ্ঞানে পৌছাতে পারে, অর্থাৎ বুঝতে পারে যে সে সহ সকল জীব মূলতঃ এক ব্রহ্মেরই বিভিন্ন প্রকাশ, তখনই কেবল সে এই প্রকৃতির বন্ধনকে সম্পূর্ণ ছিন্ন করতে পারে, অর্থাৎ মুক্তি বা মোক্ষ লাভ করতে পারে।

অন্যদিকে দ্বৈত বেদান্তবাদী জীবাত্মা ও পরমাত্মার দ্বিবিধ অস্তিত্বকে স্বীকার করেন। তার মতে প্রত্যেক জীবের মূলগত যে আত্মা, তার বাইরেও এক পরমাত্মা বা ব্রহ্মের অস্তিত্ব রয়েছে। এই পরমাত্মা বা ব্রহ্মের স্বরূপ আত্মগত হওয়ার মাধ্যমে তার সাথে লীন হওয়াই দ্বৈত বেদান্তিকের মুক্তি বা মোক্ষের পথ।

বেদান্তের এই দ্বিবিধ প্রকরণের মধ্যে মূলগত ঐক্য এখানেই যে, জীবাত্মার মুক্তি বা মোক্ষ লাভ একমাত্র ব্রহ্মজ্ঞানের মাধ্যমেই সম্পন্ন হতে পারে। অর্থাৎ, চূড়ান্তভাবে পরমাত্মা বা ব্রহ্মের মধ্যে লীন হওয়াই বেদান্তিকের পরম উদ্দেশ্য।

বেদান্ত দর্শনের নৈতিকতার মূলসূত্র এই দর্শনের অধিতত্ত্ব হতে সরাসরি প্রতিপাদিত। যেহেতু সকল জীবই ব্রহ্মের অংশ অথবা একের মধ্যে লীন হওয়াতেই সকল জীবের চূড়ান্ত মুক্তির পথ নিহিত, সেহেতু আমিসহ সকল জীবকে ব্রহ্মজ্ঞানে দেখাই প্রকৃত জ্ঞানীর লক্ষণ। অর্থাৎ, অন্য জীবের সাথে আমার মূলগত কোন পার্থক্য নেই; আমি যা, অন্য কোন জীবও ঠিক তাই। বেদান্তিকরা তাই অন্য সব জীবকে আত্ম-জ্ঞান করতে বলেন। সমগ্র জীবজগতের মধ্যে যদি আমি আমাকেই দেখি আর কোন আত্ম/পর জ্ঞান না করি, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আমার দ্বারা অন্যের প্রতি অন্যায় আচরণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। এভাবে সর্বজীবে নিজেকে বা ব্রহ্মকে দেখার মাধ্যমে প্রাচীন ভারতীয় ঋষি এমন এক নৈতিকতার ধারণা সৃষ্টি করলেন, যাকে মূলসূত্র হিসেবে ধরে নিলে নীতি-নৈতিকতার বিস্তারিত বিধিনির্দেশ প্রণয়নের আর দরকার পড়ে না। একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা যাক। অন্যের সম্পদ কেড়ে নেয়া অনৈতিক কেন? বেদান্তিক বলেন, অন্যের সম্পদ বলতে যা বুঝছি তা তো আসলে আমারই সম্পদ। মূলত অন্য বলতে যাকে বুঝছি, সে তো মূলতঃ আমি-র ভিন্ন প্রকাশ। তাহলে, অন্যের সম্পদ নেয়া মানে নিজের সম্পদই নেয়া। সুতরাং, সবার মধ্যেই আমাকে তথা ব্রহ্মকে দেখতে পারলে আমার দ্বারা অন্যের যেকোন ধরণের ক্ষতি করাই অসম্ভব হয়ে ওঠে। তাই, এই নৈতিকতার ধারণায় বিস্তারিত বিধিনির্দেশের দরকারই বা কী? বর্তমান কালের প্রেক্ষিতে সর্বজীবে আত্মজ্ঞান করার এরূপ দর্শনকে অবিশ্বাস্য এবং অসম্ভব মনে হতে পারে। তবে, প্রাচীন ভারতে গুরু-শিষ্য নির্ভর পরম্পরাগত ঐতিহ্যে এই ধরণের ব্রহ্মজ্ঞান হওয়ার মতো পরিবেশ থাকায় বাস্তবে এ ধরণের নৈতিকতাবোধে অধিকারীর অস্তিত্ব থাকা একেবারেই অসম্ভব ছিলো না।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য, অন্য জীব বলতে শুধু মানুষ বুঝানো হচ্ছে না, বরং সমগ্র জীবজগতকেই নির্দেশ করা হচ্ছে। এ কারণে হিন্দুধর্মে জীবহত্যাকে বরাবরই মহাপাপ বলা হয়েছে। কারণ জীবহত্যার মাধ্যমে আমরা আসলে ব্রহ্ম বা পরমাত্মার একটি প্রকাশকেই হত্যা করি।

বেদান্ত দর্শনের মূলতত্ত্ব থেকে আমরা গুরু-শিষ্য নির্ভর পরম্পরাগত হিন্দু ধর্ম-দর্শনের একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিত পাই। লক্ষ্যণীয়, বেদান্ত দর্শনে ব্রহ্মজ্ঞানকেই মুক্তির একমাত্র পথ বলা হয়েছে। এই ব্রহ্মজ্ঞান আয়ত্ত করার জন্য সমগ্র জীবজগত ও প্রকৃতির সাথে বিস্তারিত পরিচয় হওয়ার আবশ্যকতা রয়েছে। এই পরিচয় লাভ একমাত্র বিশুদ্ধ জ্ঞানচর্চার দ্বারাই সম্ভব। জীবজগত ও প্রকৃতির সম্পূর্ণ পরিচয় লাভ করার পরই কেবল অনুধাবন করা যেতে পারে যে, সমস্ত জীবই আসলে অভিন্ন তথা এক ও অদ্বিতীয় পরমাত্মা ব্রহ্মের বিভিন্ন প্রকাশ। হিন্দু দর্শন সম্পর্কে আমরা যতোই জানবো ততই দেখবো পরম্পরাগত জ্ঞানচর্চার উপর সকল হিন্দু দর্শনমতই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। এভাবে জ্ঞানের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়ার মাধ্যমে ভারতের দার্শনিকরা জ্ঞানচর্চার ইতিহাসকে বিকৃত ও অসংস্কৃত হওয়ার পথ থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। এই চেষ্টা অনেক ক্ষেত্রে অসফল হলেও হিন্দু ধর্ম-দর্শনের প্রায় কয়েক হাজার বছরের পরম্পরাগত জ্ঞানচর্চার ইতিহাস ও এর অসংখ্য পাঠ আমরা এখনও বিশুদ্ধ ও অবিকৃতভাবে পাই। তাই শেষ বিচারে হিন্দু দার্শনিকের উদ্দেশ্যকে অনেকাংশে সফল বলা যেতেই পারে।

যদিও কোন নির্দিষ্ট ধর্মতত্ত্ব বা দর্শনকে হিন্দুধর্ম নামে অভিহিত করার কোন উপায় নেই, তথাপি এটুকু বললে অত্যূক্তি হয় না যে, আজকে আমরা হিন্দুধর্ম বলতে যে বহুবিচিত্র তত্ত্ব-দর্শন-আচারকে বুঝি তার অধিকাংশেরই (সব নয়) মূল উৎস বেদান্ত দর্শন। উপনিষদ ও তৎপরবর্তী বেদান্ত দর্শনে যে ব্রহ্মের ধারণা পাওয়া যায়, এই ধারণাকেই পরবর্তীতে বিভিন্নভাবে স্বীকার এমনকি অস্বীকার করে হিন্দু ধর্ম-দর্শনকে বিচিত্র মত ও পথে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। উপরন্তু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মেও ঔপনিষদিক দর্শনের সুস্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। সংক্ষেপে তাই মন্তব্য করা যেতেই পারে, বেদান্তই হিন্দুধর্মের সর্বাধিক প্রভাবসৃষ্টিকারী দর্শনতত্ত্ব।

(ষষ্ঠ পর্ব এখানে)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s