হিন্দুধর্মের স্বরূপ-সন্ধানঃ চতুর্থ পর্ব

(প্রথম পর্ব এখানে)

(দ্বিতীয় পর্ব এখানে)

(তৃতীয় পর্ব এখানে)

৬. এক্ষণে প্রশ্ন উঠতে পারে, সাধারণের মধ্যে প্রচলিত ধর্মকে কি আমরা হিন্দুধর্ম হিসেবে অস্বীকার করছি? না, মোটেই তা নয়। শুধু হিন্দুধর্ম নয়, যেকোন ধর্ম অথবা রিলিজিয়ন সম্পর্কে একটি পরম সত্যি আমাদের মনে রাখতে হবে যে, মানুষ যেভাবে ধর্মকে ব্যাখ্যা করে বা দেখে, ধর্ম আসলে তা-ই। কোন বিশেষ ধর্ম ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যদি আমরা অলৌকিকত্বকে স্বীকার করে নেই, তাহলে সে ধর্মের পুস্তকে সীমাবদ্ধ ধর্ম ছাড়া ধর্মটির অন্য যেকোন রূপকেই আমাদের অস্বীকার করতে হয়; কিন্তু যদি শুধু লৌকিকভাবে ধর্মকে বুঝতে চাই, তাহলে নির্দ্বিধায় বলতে পারি, মানুষই ধর্মের সৃষ্টি করেছে, বিকশিত করেছে, আর একে দিয়েছে বিভিন্ন বৈচিত্র্যপূর্ণ রূপ। তাই যেকোন ধর্মের তাত্ত্বিক অংশে যা-ই থাকুক না কেন, সাধারণ মানুষ সেই ধর্ম বলতে কী বুঝছে তার আলোচনাও সেই ধর্মের সামগ্রিক আলোচনায় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং অপরিহার্য। লৌকিকতার সীমা ছাড়িয়ে না গেলে কোন্ খ্রিস্টধর্ম প্রকৃত খ্রিস্টধর্ম বা কোন হিন্দুধর্ম প্রকৃত হিন্দুধর্ম এ ব্যাপারে নিঃসংশয় উপসংহারে পৌছানো নিতান্তই অযৌক্তিক, তাই অসম্ভব। পৃথিবীর সকল মানুষ যারা নিজেদের খ্রিস্টান বলে মনে করে, তাদের আচরিত ধর্মই খ্রিস্টধর্ম, তার রূপ যত বিভিন্নই হোক না কেন। একইভাবে নিজেকে হিন্দু হিসেবে স্বীকার করা যেকোন মানুষের আচরিত ধর্মই হিন্দুধর্ম, তার প্রকৃতি তাত্ত্বিক হিন্দুধর্ম হতে যতই বিচ্যূত হোক না কেন।

তাহলে গত অধ্যায়ের শেষদিকে আমরা সাধারণের মধ্যে প্রচলিত হিন্দুধর্মকে কেন আমাদের আলোচনায় বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম? কারণ, আমাদের উদ্দেশ্যের সাথে এ সিদ্ধান্ত সঙ্গতিপূর্ণ। কোন ধর্মেরই তাত্ত্বিক মূল সাধারণের অনুশীলিত ধর্মে পাওয়া যায় না। আব্রাহামীয় যেকোন ধর্মের ক্ষেত্রে এদের মূল ধর্মগ্রন্থ থেকেই আমরা সেই ধর্মের তাত্ত্বিক মূলের সন্ধান পেতে পারি। কিন্তু হিন্দুধর্মের ক্ষেত্রে কোন একক ধর্মগ্রন্থ না থাকায় আর সাাধারণের মধ্যে এ ধর্মের প্রকৃতিগত বৈচিত্র্য অসংখ্য হওয়ায় এ ধর্মের মূল সন্ধান করা অপেক্ষাকৃত কঠিনতর। এই উদ্দেশ্যে পৌছাতে হলে তাই সব বিকৃতি ও বৈচিত্র্যকে সরিয়ে গুরু-শিষ্য পরম্পরানির্ভর ধর্মচর্চার ইতিহাসের দিকেই আমাদের পূর্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে।

৭. এতক্ষণের আলোচনায় বোধ হয় এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, হিন্দুধর্ম মূলতঃ ভারতবর্ষের পরম্পরাগত জ্ঞানচর্চার একটি বহুদিকমুখিন ফলাফল। ভারতবর্ষে ধর্মতত্ত্বের বাইরে যেসব জ্ঞানের শাখার চর্চা হয়েছে, যেমন গণিত, জ্যোতিষ, সাহিত্য, অলঙ্কার, ব্যাকরণ, এমনকি কামশাস্ত্র, এসবকেও ঐতিহাসিকভাবে ধর্মতত্ত্বের অন্তর্গত বিষয় হিসেবেই দেখা হয়েছে। এভাবে বিচার করতে গেলে, ভারতবর্ষে চর্চিত জ্ঞানের সকল শাখাই হিন্দুধর্মের অধীন। তবে বর্তমান প্রবন্ধে হিন্দুধর্মতত্ত্বের আওতাকে সীমিত করে আমরা একে কেবল অধিতত্ত্ব এবং এই অধিতত্ত্ব দ্বারা সিদ্ধ নীতি-নৈতিকতামূলক জ্ঞানচর্চার পরম্পরার মধ্যেই রাখছি। আমাদের প্রার্থিত উদ্দেশ্যে পৌছাতে হলে হিন্দুধর্মের এই পরম্পরাগত ঐতিহ্য ধরেই এগোতে হবে। বলা বাহুল্য, ভারতবর্ষে আর্যদের আগমন এবং তাদের প্রণীত বেদের সময়কালই এই পরম্পরার সূচনাবিন্দু।

৮. মূল আলোচনায় প্রবেশের পূর্বে আমাদের স্বতঃসিদ্ধ সত্য হিসেবে ধরে নিতে হবে, হিন্দুধর্ম বলতে আমরা যা বুঝি, তার সমস্তটাই মানুষের সৃষ্টি ও কল্পনা। অর্থাৎ, অপ্রাকৃতিক বা অলৌকিক কোনকিছুর অস্তিত্বকে আমরা প্রথমেই অস্বীকার করছি। ফলস্বরূপ ধর্মশাস্ত্রকে আমরা ঈশ্বর প্রেরিত হিসেবে না দেখে বিবেচনা করছি মানুষ কর্তৃক সৃষ্ট ও কল্পিত জ্ঞানের আধার হিসেবে। তাহলে বলতে পারি, হিন্দুধর্মের প্রধান শাস্ত্র হিসেবে বিবেচিত বেদ, উপনিষদ, ভগবদগীতা, পুরাণ এসবই মনুষ্যসৃষ্ট। যদি আমরা এভাবে দেখতে পারি, তাহলে হিন্দুধর্মের অধিতাত্ত্বিক জ্ঞানকে আমরা মানুষ কর্তৃক সৃষ্টিকে বুঝবার একটি পরম্পরাগত ইতিহাস হিসেবেও দেখতে পারি। বস্তুতঃ আমাদের এখনকার আলোচনায় প্রবেশের জন্যে এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা একাান্তই আবশ্যক।

এই প্রবন্ধে পূর্বে একবার মন্তব্য করা হয়েছে যে, সচেতনতাই জ্ঞানের সূচনাবিন্দু; মানুষের জ্ঞানের পথের যাত্রা শুরু মানুষের সচেতন হয়ে ওঠার সময় থেকেই। প্রাথমিক অবস্থায় মানুষের জ্ঞানের ভান্ডার ছিলো সীমিত, একইসাথে সঠিক জ্ঞানে পৌছানোর মতো উপকরণ বা কলাকৌশলও ছিলো সীমিত। সেই অবস্থায় মানুষের জ্ঞানলাভের উপায় ছিলো দ্বিবিধঃ পর্যবেক্ষণ, ও চিন্তাশক্তি। এই প্রাচীন ও অবিকশিত পর্যবেক্ষণের সাথে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের কোন সম্বন্ধ নেই। বিজ্ঞানী যেভাবে অভিজ্ঞতালব্ধ পর্যবেক্ষণ ও সেই পর্যবেক্ষণের সিদ্ধতা-ত্রুটি-বিচ্যূতি বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার মাধ্যমে প্রকৃতিকে একটি সূত্রের মাধ্যমে আনার চেষ্টা করেন, প্রাচীনকালের পর্যবেক্ষণে তার কিছুই ছিলো না। শুধু প্রকৃতিকে নিরন্তর দেখে যাওয়া এবং এই দেখার মধ্যে এক ধরণের নিয়ম সন্ধান করার মধ্যেই সেই প্রাচীন পর্যবেক্ষণের আওতা সীমাবদ্ধ ছিলো। এই পর্যবেক্ষণের ফলে কোন বৈজ্ঞানিক সূত্র আবিষ্কার করা সম্ভব ছিলো না, তবে দৃশ্যমান কিছু নিয়ম এই পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই মানুষ জানতে ও বুঝতে পেরেছিলো। অবশ্য আদিম জ্ঞানচর্চায় পর্যবেক্ষণ অপেক্ষা চিন্তা বা ধ্যান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো। পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পাওয়া অভিজ্ঞতাকে কোন তত্ত্বের আকারে নিতে প্রাচীন মানুষের চিন্তাশক্তি ভিন্ন দ্বিতীয় কোন বিকল্প ছিলো না। এ কারণে বৈদিক ও পৌরাণিক যুগে, সত্যি কথা বলতে ইংরেজ আগমনের আগ পর্যন্ত ভারতবর্ষের সমগ্র ইতিহাসেই, শুধুমাত্র চিন্তা বা ধ্যানের মাধ্যমে সকল প্রাকৃতিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে। এক হাজার খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী কয়েকেশো বছরে আরব ও পারসিকদের দ্বারাই মূলতঃ আধুনিক বিজ্ঞানের একটি প্রাথমিক রূপরেখা কল্পনা করা হয়, যার মূলসূত্র প্রণয়ন ও পরিপূর্ণ প্রয়োগ হওয়া শুরু হয় ইউরোপীয় পুর্নজাগরণের সময়ে। তাই বলতে পারি, বৈদিক যুগে মূলতঃ খোলা চোখের পর্যবেক্ষণ ও চিন্তা বা ধ্যান, এই দুইয়ের মাধ্যমেই মানুষ জ্ঞানান্বেষণের চেষ্টা চালিয়েছে।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, হিন্দু দার্শনিকরা সঠিক জ্ঞান নির্ণয় করতে যথেষ্ট উন্নত একটি যুক্তিশাস্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন; এই যুক্তিশাস্ত্রকে আমরা চিন্তা বা ধ্যানের ফলাফল হিসেবেই দেখছি। আরেকভাবে যদি বলি, ভারতের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে দর্শন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো নিঃসন্দেহে, কিন্তু এই ইতিহাসে আধুনিক অর্থে বিজ্ঞান বলতে আমার যা বুঝি তার কোন ভূমিকা কখনোই ছিলো না।

আত্মসচেতন হওয়ার পর মানুষ যখন প্রকৃতিকে একজন পর্যবেক্ষকের দৃষ্টি দিয়ে দেখা শুরু করলো, তখন সে প্রথমেই বুঝতে পারলো, বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির অনুগ্রহের উপর তার অস্তিত্ব নির্ভরশীল। সূর্য, চন্দ্র, বৃষ্টি, জল, বাতাস এরূপ শক্তি দ্বারা তার জীবন নিয়ন্ত্রিত, এই সহজ সত্য আবিষ্কার করার পর স্বাভাবিকভাবে প্রাকৃতিক শক্তিকেই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে মানুষ গ্রহণ করে নিলো। পরবর্তীতে যেহেতু প্রাকৃতিক শক্তি দ্বারা আমার সম্পূর্ণ জীবন নিয়ন্ত্রিত, সেহেতু নিয়মিত প্রাকৃতিক শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা বা সম্মান জানানো আমার কর্তব্য- এই বোধ থেকেই বৈদিক যুগে উপাসনার ধারণার উৎপত্তি। বৈদিক যুগে মানুষের প্রকৃতির উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা থাকায় বৈদিক ধর্মকে বলা যায় সম্পূর্ণ প্রকৃতিনির্ভর ধর্ম। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর নগর সভ্যতা থেকে বিমুক্ত করে নিজেদেরকে আমরা যদি অরণ্যে স্থাপন করতে পারি, যেখানে আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা নির্ভর করবে প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তির উপর, তাহলে আমাদের মধ্যে আজকের দিনেওু এই উপলব্ধি বোধ করা হয়তো অসম্ভব হবে না। প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগের এই প্রাচীন প্রকৃতিনির্ভর বৈদিক ধর্ম আজকের বিবর্তিত হিন্দুধর্মেও প্রোথিত আছে, যদিও আধুনিক কোন হিন্দুর পক্ষে এভাবে প্রকৃতিকেন্দ্রিক চিন্তা করার সুযোগ আর নেই।

এই বিচিত্র প্রাকৃতিক শক্তিকে বিভিন্ন দেবতা হিসেবে কল্পনা করলেও অন্ততঃ বৈদিক যুগে তাদের উপর অলৌকিকত্ব আরোপের চেষ্টা খুব একটা করা হয়নি। বৈদিক সাহিত্যে দেবতাকে অলৌকিক কোন কাজকর্মে লিপ্ত থাকতে দেখা যায় না। প্রথমদিকের বৈদিক সাহিত্যে (প্রধানত ঋক, সাম, যজুঃ ও অথর্ব নামে চারটি সংহিতাতে) এই প্রাকৃতিক শক্তির ধারক বিভিন্ন দেবতা যেমন ইন্দ্র, অগ্নি, বরুণ, পবন প্রভৃতির উপাসনার বিস্তৃত পদ্ধতি সন্নিবেশিত আছে। এ সময়ে এই প্রাচীন দেবতারাই উপাসনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, আর বৈদিক ধর্ম মূলতঃ এদের উপাসনারই ধর্ম। তবে এইসব সংহিতায় বৈদিক দেবতাদের পাশাপাশি এক ও অদ্বিতীয় এক সৃষ্টিকর্তার ধারণাও প্রচ্ছন্নভাবে পাওয়া যায়। তবে এই সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরের ধারণা স্পষ্টীকৃত এবং নির্দিষ্ট রূপ পায় পরের দিকের বৈদিক সাহিত্যে (প্রধানত উপনিষদে)। বৈদিক সাহিত্যের এই ঈশ্বরের নাম ব্রহ্ম। হিন্দুধর্মের মূল বলে যদি কিছু থাকে, তাহলে এই ব্রহ্মের ধারণাতেই তা পাওয়া সম্ভব। পরবর্তীতে বিভিন্ন বিচিত্রপথগামী হয়ে অনেক হিন্দু বিশ্বাস ব্রহ্মের ধারণা থেকেই বিচ্যুত হয়ে পড়ে, তবে হিন্দু ধর্ম ও দর্শনের প্রধান অংশই মূলত এই ব্রহ্মতত্ত্ব ও এই তত্ত্বের সম্প্রসারণ। তাই, হিন্দুধর্মের স্বরূপ বুঝতে গেলে ব্রহ্ম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা অপরিহার্য।

প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তির দেবত্ব অর্থাৎ শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেওয়ার সাথে সাথেই বৈদিক ঋষির কৌতূহল নিবৃত্ত হয়নি। তার দৃষ্টি ক্রমশঃ প্রসারিত হয়ে মানুষসহ সকল প্রাণি ও উদ্ভিদজগতে, জড়জগতে, এমনকি অন্তরীক্ষে পর্যন্ত গিয়ে পৌছেছিলো। পর্যবেক্ষণ যতোই ঋদ্ধ হচ্ছিলো, ততোই সেই প্রাচীন ঋষিরা বুঝতে পারছিলেন, শুধু তার চারপাশের প্রকৃতি নয়, বরং সমগ্র পৃথিবী, অন্তরীক্ষ, প্রাণি, উদ্ভিদ, জড়- এক কথায় অস্তিত্বশীল সবকিছুর মধ্যেই এক ধরণের আন্তঃসম্পর্ক বিদ্যমান। এভাবে প্রকৃতির অন্তর্গত সব উপাদানের পরস্পরের উপর নির্ভরশীলতাকে ঋষিরা আবিষ্কার করলেন। পরের ধাপে বৈদিক ঋষি তাই চিন্তা করলেন, যেহেতু অস্তিত্বশীল সমস্ত উপাদান একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত, সেহেতু এ সকল উপাদানের মধ্যে আসলে কোন পার্থক্য নেই, অর্থাৎ মূলগতভাবে এরা সবাই অভিন্ন, এক। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, আমি আর আমার চারপাশের সকল প্রাণি, উদ্ভিদ, জড়বস্তু, শক্তি, এমনকি আকাশের গ্রহনক্ষত্র সবাই মূলগতভাবে একই বস্তু, শুধু আমাদের প্রকাশ আর প্রকৃতিতেই যা কিছু ভিন্নতা। এই অভিন্ন বস্তুকেই ঋষিরা বলেছেন ‘আত্মা’। আমাদের সবার এই অভিন্ন আত্মা খন্ডাংশরূপে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে অস্তিত্বশীল, আর এই খন্ড আত্মার যে বৃহৎ অখন্ড স্বরূপ, তা-ই পরমাত্মা, পরমেশ্বর, বা ব্রহ্ম।

সকল বস্তুর অভিন্নতাবোধ এবং মূল ও আদি বস্তু হিসেবে এক পরমেশ্বর ব্রহ্মের ধারণা- সংক্ষেপে এই হলো আমার বিবেচনায় হিন্দু ধর্মের আদি মূল। কিন্তু এই প্রকৃতি ও ব্রহ্মের স্বরূপ ও সম্পর্ক নির্ধারণ করতে গিয়ে হিন্দু দার্শনিকগণ এত বিচিত্র পথে চলে গেছেন যে, অনেক পথের মধ্যেই আদি ব্রহ্মের ধারণাই খুজেঁ পাওয়া কষ্টসাধ্য। অনেক হিন্দু দর্শন এমনকি পরমেশ্বর ব্রহ্মের ধারণাকে বাতিল করেই এগিয়েছে। তাই এই ব্রহ্ম নির্ভর মূলতত্ত্বের দ্বারাও হিন্দু ধর্মদর্শনের সব সূত্রকে একত্রে গ্রন্থিত করা সম্ভব হয় না। কিন্তু এই ব্রহ্ম নির্ভর ধারণা থেকেই এমন আরেকটি ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যাকে ভিত্তি হিসেবে ধরে নিলে সকল হিন্দু ধর্মদর্শন, এমনকি বৌদ্ধ ও জৈন দর্শনকেও সমসূত্রে গ্রন্থিত করা যায়। ধারণাটি হচ্ছে মুক্তি, মোক্ষ, বা নির্বাণ। ভারতীয় প্রায় সব ধর্ম-দর্শনের প্রধান আলোচ্য বিষয়, কীভাবে এই জীবদেহ, দুঃখময় জীবন, বা প্রকৃতির বন্ধন হতে মুক্তি লাভ করা যায়। হিন্দুধর্মের স্বরূপ বলতে আমরা তাহলে এতটুকু বুঝতে পারি যে, এই ধর্ম মূলতঃ জীবের মুক্তি বা মোক্ষ লাভের উপায়। তাহলে আমরা বলতে পারি, হিন্দুধর্মের মূল স্বরূপ কোন প্রশ্নের উত্তরে নেই, বরং তা আছে একটি প্রশ্নের উত্থাপনে। কারণ মুক্তি বা মোক্ষ বলতে কী বুঝায় আর এই মুক্তি লাভের উপায়ই বা কী- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে হিন্দু ধর্ম-দর্শন পুনরায় বিচিত্রপথগামী হয়ে গেছে। তবে সকল হিন্দু ধর্মদর্শনেই, এমনকি বৌদ্ধ বা জৈন দর্শনেও, মুক্তি বা মোক্ষ লাভকেই জীবনের ও ধর্মের পরম ও চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হিসেবে দেখা হয়েছে।

তাহলে হিন্দুধর্মের স্বরূপ সম্পর্কে আমরা এরূপ সিদ্ধান্তে আসতে পারিঃ

প্রথম, হিন্দুধর্মের আদি মূল এক ও অদ্বিতীয় পরম ব্রহ্মের ধারণায়। তবে পরবর্তীতে কিছু হিন্দু ধর্ম-দর্শন এই আদি মূলের জায়গা থেকে সরে গেছে। এ কারণে শুধু ব্রহ্মের ধারণাকেই হিন্দুধর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য বলে চিহ্নিত করা যায় না।

দ্বিতীয়, হিন্দু সকল ধর্ম-দর্শনেই প্রধান আলোচনার বিষয় করা হয়েছে মুক্তি বা মোক্ষ লাভকে; এই মুক্তি বা মোক্ষ লাভের ধারণা এসেছে ব্রহ্মের ধারণা থেকে।

তৃতীয়, যেহেতু মুক্তি বা মোক্ষ লাভই সকল হিন্দুশাস্ত্রের মূল বিবেচ্য বিষয়, সেহেতু মুক্তি বা মোক্ষ লাভের উপায়কেই হিন্দুধর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

ব্রহ্ম ও মোক্ষ- হিন্দুধর্মের এই প্রধান দুই মূলের তাত্ত্বিক আলোচনা অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে এখানে সারতে হয়েছে, কারণ এই তত্ত্বদ্বয়কে বিশদ করতে গেলে আমাদের নির্দিষ্ট কোন দর্শনমত ধরেই এগোতে হবে। আমাদের আলোচনায় যেহেতু এই মূলদ্বয়ের বোধগম্যতা জরুরী, সেহেতু আমরা এখন তিনটি পথে এদের মোকবিলা করবো- বেদান্ত, সাংখ্য, ও পুরাণ।

পরের অধ্যায়ে আমাদের দেখতে হবে, কেন অসংখ্য দার্শনিক মত ও পথ থাকতে আমরা এই তিনটিকেই বেছে নিলাম।

(পঞ্চম পর্ব এখানে)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s