হিন্দুধর্মের স্বরূপ-সন্ধানঃ প্রথম পর্ব

১. অধুনা আব্রাহামীয় ধর্মসমূহের দোর্দন্ড প্রতিপত্তির কারণে অনাব্রাহামীয় ধর্মসমূহকেও আব্রাহামীয় ধর্মের প্রেক্ষিতে বিচার করার প্রবণতা প্রাচীন প্রচলিত ধর্মমত বিশেষত হিন্দু  ও বৌদ্ধধর্মের স্বরূপ উদঘাটনে বিশেষ বিঘ্নের কারণ হিসেবে কাজ করে। ইউরোপের আলোকায়ন এবং পুর্নজাগরণ প্রক্রিয়া আধুনিক বিজ্ঞানের উপর অনেকাংশে দৃঢ়ীভূত হলেও খ্রিস্টধর্মের বিশাল অথচ আপাত অগোচরীভূত প্রভাবও এই প্রক্রিয়ায় নিতান্ত অল্প ছিলো না।  এ কারণেই দেখি, আব্রাহামীয় ধর্মসমূহ তাত্ত্বিক ও নৈতিকভাবে যেমনিভাবে সুনির্দিষ্ট ও সুনিয়ন্ত্রিত, তেমনিভাবে ইউরোপীয় সভ্যতার মানদন্ডে জাগতিক ও পারমার্থিক সকল বস্তুর সংজ্ঞা বা মৌলিক বৈশিষ্ট্যও সুনির্দিষ্ট ও সুনিয়ন্ত্রিত। এর বহুবিধ ফলের একটি, ধর্ম বা রিলিজিয়ন বলতেও আমরা এখন সুনির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যের সমষ্টিকেই বুঝি ; বলাবাহুল্য, এই বৈশিষ্ট্যসমূহ সর্বতোভাবে একমাত্র আব্রাহামীয় ধর্মত্রয়ীর মধ্যেই দেখা যায়, অন্যদিকে ভারতীয় প্রাচীন কোন ধর্মমতের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্যসমূহ একেবারেই অপ্রতুল।

তাই, হিন্দুধর্মের স্বরূপ বুঝতে হলে প্রথমেই আব্রাহামীয় মানদন্ডে ধর্মের সংজ্ঞায়ন সম্পূর্ণরূপে পরিহার করতে হবে। তবে, এক্ষেত্রে কী পরিহার করছি এটুকু সম্পর্কে সংক্ষেপে একটু ধারণা থাকা আবশ্যক বলে মনে করি। আব্রাহামীয় ধর্মের মানদন্ডে যেকোন ধর্মের সর্বাগ্রেই থাকবে একটি সুনির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থ। এই ধর্মগ্রন্থের বিষয়বস্তুর প্রকার দ্বিবিধ: অধিতাত্ত্বিক, এবং নীতি-নৈতিকতামূলক। অধিতাত্ত্বিক অংশে থাকবে এই মহাবিশ্ব ও মানুষ সৃষ্টির আদি কারণ এবং এই সৃষ্টির উদ্দেশ্য; নীতি-নৈতিকতামূলক অংশে থাকবে অধিতাত্ত্বিক অংশে বর্ণিত উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচার-ব্যবহার,  উপাসনাপদ্ধতি, এবং পুরস্কার ও শাস্তির বিস্তারিত বিবরণ। আব্রাহামীয় ধর্মত্রয়ীরই এসব মৌলিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। অন্যদিকে ভারতবর্ষে উদ্ভূত হিন্দু, বৌদ্ধ বা জৈন ধর্মের কোনটিরই সুনির্দিষ্ট কোন ধর্মগ্রন্থ নেই; এদের অধিতাত্ত্বিক ইতিহাস বিভিন্ন প্রকার; সবোর্পরি, নীতি-নৈতিকতার নির্দেশেও এরা চূড়ান্তভাবে অনির্দিষ্ট।

সুতরাং, প্রথমেই স্বীকার্য, হিন্দুধর্ম আব্রাহামীয় বা ইউরোপীয় মানদন্ড অনুসারে ধর্ম (রিলিজিয়ন) এর কোন পূর্বশর্তই পূরণ করে না। এক্ষণে, বর্তমানে হিন্দু শব্দটিকে কেন একটি ধর্ম হিসেবে নির্দেশ করা হয় তা বুঝতে গেলে কীভাবে ‘হিন্দু’ একটি জাতি থেকে একটি ধর্ম নির্দেশক শব্দে পরিণত হলো তার সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের দিকে একটু তাকাতে হবে।

২. পূর্বেই বলা হয়েছে, আধুনিক ইউরোপীয় সভ্যতা জাগতিক এবং পারমার্থিক সকল বিষয়কেই সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও শ্রেণীর মধ্যে আনার চেষ্টায় বদ্ধপরিকর। এর ফল হয়েছে দ্বিবিধ। এক দিকে, এভাবে সকল বিষয়কে শ্রেণীবদ্ধ করায় জ্ঞানার্জনের পথ অনেক বেশি সহজ ও প্রশস্ত হয়েছে।  প্রকৃতি বিশাল ও অনভিজ্ঞ চোখে নিতান্তই খেয়ালী-স্বভাব; তাই প্রকৃতিকে বুঝতে চাইলে এর সমগ্রতা ধরতে না চেয়ে একে অসংখ্য সুনির্দিষ্ট শাখা-প্রশাখায় বিভাজন করে খন্ডিতভাবে এগোনোই অধিক কার্যকরী। আধুনিক ইউরোপীয় সভ্যতার সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব এখানেই যে, এই সভ্যতা মানুষের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জ্ঞানকে শ্রেণী- ও প্রণালি-বদ্ধ করতে সমর্থ হয়েছে, এভাবে জ্ঞানার্জনের পথকেও করেছে সুগম।

কিন্তু এই শ্রেণীবদ্ধ করার কাজ করতে গিয়ে একটি অনৈচ্ছিক কুফল ঘটে গেছে। শ্রেণীবদ্ধ করার মানেই হলো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা বা বৈশিষ্ট্যর মধ্যে যাবতীয় সব বিষয়কে বেঁধে ফেলা। কিন্তু অনেক বিষয়কে এভাবে বাঁধতে গিয়ে ওই বিষয়ের অনেক বৈচিত্র্য, ভিন্ন অর্থ বা ব্যাখ্যা হারিয়ে বা ঢাকা পড়ে গেছে। বৃহত্তর জ্ঞানার্জনের পথে এটুকু জরিমানাকে আমরা ইতিমধ্যেই স্বীকার করে নিয়েছি; কিন্তু এও স্মতর্ব্য, কোন বিষয়ের মূলে পৌছাতে হলে প্রচলিত সংজ্ঞার বাইরে থেকেও এর উপর আলো ফেলা অনেক সময় জরুরী হয়ে পড়ে।

ধর্ম  হিসেবে হিন্দু শব্দটির প্রয়োগ  মূলত ইউরোপীয় সভ্যতার এই শ্রেণীকরণ প্রবণতারই  ফল। প্রাচীন পারসিকেরা ভারতবর্ষের সকল অধিবাসীদেরকেই হিন্দু নামে অভিহিত করতো। সিন্ধু নদের তীরে বাসকারী অধিবাসীরাই হিন্দু। নামটি সিন্ধুই থাকতো; পারসিকেরা ‘স’ এর পরিবর্তে ‘হ’ উচ্চারণ করায় সিন্ধু হয়ে গেছে হিন্দু। ভারতবর্ষে প্রথম প্রভাব সৃষ্টিকারী আব্রাহামীয় ধর্ম ইসলাম ভারতে আসার পর যখন ভারতের বিশাল একটা জনগোষ্ঠী এই ধর্ম গ্রহণ করলো, তখন মুসলমান শাসকেরা ভারতের অ-মুসলমান সব জনগোষ্ঠীকেই অভিহিত করলো হিন্দু নামে। তখনো মুসলমান ব্যতীত ভারতের আর সকল জনগোষ্ঠীর জাতিগত পরিচয় নির্দেশ করতেই হিন্দু শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছিলো। সর্বশেষ ইউরোপীয়রা ভারতবর্ষে আসার পর অমুসলমান সকল জনগোষ্ঠীকে তারা বিভক্ত করলো হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এরূপ নির্দিষ্ট কয়েকটি ধর্মের অনুসারীতে। ভারতীয় প্রাচীন সব ধর্মমতের মধ্যে বৌদ্ধ এবং জৈন এই দুইটি মতবাদের স্বতন্ত্র পরম্পরাগত ইতিহাস চিহ্নিত করা যায়; কিন্তু অপরাপর প্রচলিত সব মতবাদকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মমতের আধারে বিচেনার করা সঙ্গত না হলেও ইউরোপীয় শ্রেণীকরণ প্রবণতার ফলস্বরূপ এই সকল মতবাদের সকল অনুসারীদের একত্রে চিহ্নিত করা হলো হিন্দু নামে। সেই থেকে ভারতবর্ষের অমুসলমান, অবৌদ্ধ, অজৈন সকল জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় পরিচয় হলো হিন্দু।

 

(দ্বিতীয় পর্ব এখানে)

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s