মার্কেজ এর সাক্ষাৎকার

(সাহিত্য পত্রিকা ‘দ্য প্যারিস রিভিউ’ এর ‘দ্য আর্ট অভ ফিকশন’ বিভাগে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারের অনুবাদ)

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের এই সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয় স্যান এ্যানজেল ইন-এ তার বাড়ির পেছনে মেক্সিকো সিটির বর্ণিল ফুলে বেষ্টিত, পুরোনো এবং সুন্দর অফিসঘরটিতে। মূল বাড়ি থেকে অল্প হাঁটার দূরত্বে ঘরটি। এই নীচু উল্লম্ব ভবনটিকে দেখে মনে হয়, এটিকে বানানো হয়েছিলো একটি অতিথিশালা হিশেবে। এর ভেতরে এক প্রান্তে আছে একটি কাউচ, দুইটি আরাম কেদারা আর একটি অস্থায়ী বার- একটি সাদা ফ্রিজ আর তার উপরে খনিজ পানির যোগান।

ঘরটির সবচেয়ে লক্ষণীয় বস্তুটি আছে সোফার উপরে- স্টাইলিশ কেইপ (হাতাহীন এক ধরনের কোট) পরা মার্কেজের একটি বিশাল একক ছবি, যেখানে মার্কেজ দাঁড়িয়ে আছেন প্রবল বাতাস বয়ে যাওয়া কোন জায়গায়; ছবিটির পটভূমি এবং মার্কেজের পরিচ্ছদ এসব মিলিয়ে তাকে দেখাচ্ছিলো অনেকটা এ্যান্থনি কুইনের মতো।

গার্সিয়া মার্কেজ ঘরটির শেষ প্রান্তের একটি ডেস্কে বসেছিলেন। আমাকে দেখে তিনি অভিবাদন করতে এগিয়ে এলেন, বেশ প্রাণবন্ত এবং ধীর পদক্ষেপে । তার দেহ সুগঠিত, উচ্চতায় তিনি প্রায় পাঁচ ফুট আট অথবা নয়, দেখতে যাকে একজন ভালো মিডলওয়েট মুষ্টিযোদ্ধার মত মনে হয়- চওড়া বুক, কিন্তু পা সম্ভবত কিছুটা সরু। কর্ডুরয় পাজামার সাথে গলাবন্ধ সোয়েটার ছিল তার পড়নে, আর পায়ে ছিল কালো চামড়ার বুট। তার চুল কোঁকড়ানো ও বাদামী আর গাল গোঁফে ভর্তি।

সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয় তিন সন্ধ্যায় মোটামুটি দুই ঘন্টাব্যাপী তিনটি পর্বে। যদিও তার ইংরেজী যথেষ্ট ভালো, তবু্‌ও গার্সিয়া মার্কেজ বেশিরভাগ কথা বলেছেন স্প্যানিশেই আর তার দুই ছেলে সেইসব অংশের অনুবাদ করে দিয়েছেন। মার্কেজ যখন কথা বলেন, তখন তার শরীর সামনে পেছনে প্রায়ই দুলতে থাকে। কোন কথায় গুরুত্বারোপ করতে, অথবা তার চিন্তার দিক পরিবর্তন নির্দেশ করতে, তিনি বেশির ভাগ সময় তার হাত নাড়ানোর মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত কিন্তু চূড়ান্ত ইঙ্গিত দেন। চিন্তাশীল কিছু বলার সময় হয় তিনি তার শ্রোতার দিকে ঝুঁকে আসেন, অথবা চেয়ারে পেছন দিকে হেলে পড়ে তার পা ভেঙ্গে বসেন।

প্রশ্নঃ টেপ রেকর্ডার ব্যবহার করলে কি আপনার কোন অসুবিধা হবে?

মার্কেজঃ সমস্যাটা হলো যখনই আপনি জানবেন আপনার সাক্ষাৎকার রেকর্ড করা হচ্ছে, তখনই আপনার মনোভাব পালটে যাবে। আমার বেলায় আমি সাথে সাথে একটি রক্ষণাত্মক ভঙ্গি গ্রহণ করে ফেলি। সাংবাদিক হিশেবে আমার মনে হয়, সাক্ষাৎকার গ্রহণ করার সময় টেপ রেকর্ডার কিভাবে ব্যবহার করতে হয় তা আমরা এখনো শিখিনি। আমি মনে করি, কোন সাংবাদিকের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সর্বোত্তম উপায় হলো কোন নোট নেওয়া ছাড়াই দীর্ঘক্ষণ ধরে সাক্ষাৎকারদাতার সাথে কথা বলা। পরবর্তীতে সাংবাদিক পুরো কথোপকথনটি সম্পর্কে চিন্তা করবেন এবং এই কথোপকথনের ফলাফল তার নিজের মত করে তিনি লিখবেন; এখানে সব শব্দ বা বাক্যের অবিকৃত থাকার প্রয়োজন নেই। আরেকটি কার্যকর পদ্ধতি হলো সাক্ষাৎকারের সময় নোট নিতে থাকা এবং পরবর্তীতে সাক্ষাৎকারদাতার প্রতি বিশ্বস্ততা রেখে সাক্ষাৎকারটিকে সাজানো। টেপ রেকর্ডার সম্পর্কে বিরক্তিকর ব্যাপারটি হলো এটি সাক্ষাৎকারদাতার প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বস্ত থাকে না, কারণ যদি আপনি সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে বোকার মত কিছু বলে বসেন, টেপ রেকর্ডার তা্ও রেকর্ড করে এবং তা মনে রাখে। এ কারণে টেপ রেকর্ডার থাকলে আমি সচেতন থাকি যে আমার সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে; আর এটি না থাকলে আমি অসচেতন এবং সম্পূর্ণ সহজাত ভাবে কথা বলতে পারি।

প্রশ্নঃ এখন তো আমি টেপ রেকর্ডার ব্যবহার করছি বলে নিজেকে কিছুটা দোষী মনে করছি। তবে আমার মনে হয় এই ধরণের সাক্ষাৎকারে আমাদের এটার প্রয়োজন হবে।

মার্কেজঃ আসলে আমি যা এতক্ষণ বললাম তার মূল উদ্দেশ্য ছিলো বরং আপনাকেই রক্ষণাত্মক অবস্থায় ফেলা।

প্রশ্নঃ তাহলে আপনি কখনো সাক্ষাৎকার নেওয়ার বেলায় টেপ রেকর্ডার ব্যবহার করেননি?

মার্কেজঃ সাংবাদিক হিশেবে আমি কখনো এটা ব্যবহার করিনা। আমার খুব ভালো একটা টেপ রেকর্ডার আছে, কিন্তু আমি এটা শুধু গান শুনতে ব্যবহার করি। অবশ্য সাংবাদিক হিশেবে আমি কখনও সাক্ষাৎকারই নেইনি। আমি অনেক প্রতিবেদনের কাজ করেছি, কিন্তু কখনো প্রশ্নোত্তর ভিত্তিক কোন সাক্ষাৎকারের কাজ করিনি।

প্রশ্নঃ আমি ডুবে যাওয়া কোন এক জাহাজের একজন নাবিকের সঙ্গে একটি বিখ্যাত সাক্ষাৎকারের কথা শুনেছি।

মার্কেজঃ ওইখানে প্রশ্নোত্তর ছিল না। নাবিকটি শুধু তার অভিজ্ঞতার কথা আমাকে বলেছিলেন, যে অভিজ্ঞতা আমি তার নিজের শব্দ ব্যবহার করে প্রথম পুরুষে পুনর্লিখনের চেষ্টা করেছি, যাতে এই লেখাকে সেই নাবিকের নিজের লেখা বলেই মনে হয়। যখন সেই লেখা ধারাবাহিকভাবে প্রতি দুই সপ্তাহান্তে একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছিলো, তখন সেই লেখা স্বাক্ষরিত হত আমাকে দিয়ে না, বরং সেই নাবিককে দিয়েই। বিশ বছর পরে পুনঃপ্রকাশের আগ পর্যন্ত কেউ জানতেই পারেনি যে ওই লেখাটা আসলে আমার ছিলো। ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অভ সলিচিউড’ লেখার আগে কোন সম্পাদকেরও ওই লেখাটাকে ভালো মনে হয়নি।

প্রশ্নঃ যেহেতু আমরা সাংবাদিকতা সম্পর্কে কথা বলতে শুরু করেছি, এত বছর ধরে উপন্যাস লেখার পর আবার সাংবাদিকতার কাজ করার অনুভূতি কেমন? আপনার অনুভূতি বা দৃষ্টি কি এখন ভিন্নতর?
মার্কেজঃ আমার সবসময়ই মনে হয়েছে যে আমার সত্যিকার পেশা হচ্ছে সাংবাদিকতা। আগে সাংবাদিকতা সম্পর্কে আমার অপছন্দের ব্যাপার ছিল একটাই- কাজের পরিবেশ। এছাড়া, পত্রিকার স্বার্থ আমার চিন্তাভাবনা আর ধ্যানধারণায় প্রভাব ফেলতো। এখন, ঔপন্যাসিক হিশেবে কাজ করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করার পর, আমি প্রকৃত অর্থে আমার আগ্রহ আর ধারণার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বিষয় নির্বাচন করতে পারি। যেভাবেই হোক, আমি সবসময় সাংবাদিক হিশেবে কাজ করার সুযোগকে উপভোগ করি।

প্রশ্নঃ আপনার কাছে সাংবাদিকতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ কোনটি?

মার্কেজঃ জন হেরেসির ‘হিরোশিমা’ একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ।

প্রশ্নঃ এমন কোন বিষয় কি আছে যেটার উপর আপনি এখন বিশেষভাবে কাজ করতে পছন্দ করবেন?

মার্কেজঃ এরকম অনেক বিষয়ই আছে, এদের অনেককে নিয়ে আমি লিখেছিও। পর্তুগাল, কিউবা, এ্যাঙ্গোলা এবং ভিয়েতনাম নিয়ে আমি লিখেছি। পোল্যান্ড নিয়ে আমার লেখার খুব ইচ্ছে। আমার মনে হয় যদি আমি পোল্যান্ডের এখনকার প্রকৃত অবস্থা বর্ণণা করতে পারি, সেটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে। কিন্তু এখন পোল্যান্ডে শীত অনেক আর আমি এমন একজন সাংবাদিক যে আরামআয়েশ খুব পছন্দ করে।

প্রশ্নঃ আপনি কি মনে করেন সাংবাদিকতা যা করতে পারে না এরকম অনেক কিছু উপন্যাসের দ্বারা করা সম্ভব হতে পারে?

মার্কেজঃ না। আমার মনে হয় না এদের মধ্যে সেই অর্থে কোন পার্থক্য আছে। এদের উৎস একই, বিষয় একই, পুঁজি একই, ভাষাও একই। ড্যানিয়েল ডিফো’র ‘দ্য জার্নাল অভ দ্য প্লেগ ইয়্যার’ একটি মহৎ উপন্যাস; অন্যদিকে ‘হিরোশিমা’ সাংবাদিকতার একটি মহৎ উদাহরণ।

প্রশ্নঃ কল্পনার সাথে সত্যের ভারসাম্য নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে সাংবাদিক আর ঔপন্যাসিকের দায়িত্ব কি দুইরকম নয়?

মার্কেজঃ সাংবাদকিতায় একটা মাত্র মিথ্যা পুরো কাজটাকেই নষ্ট করে দেয়। বিপরীতভাবে উপন্যাসে একটা সত্যি পুরো কাজটাকে বৈধতা দেয়। এটাই একমাত্র পার্থক্য, আর এটা লেখকের দায়িত্বশীলতার উপর নির্ভর করে। একজন ঔপন্যাসিকের স্বাধীনতা রয়েছে যেকোনকিছু করার, কিন্তু এমনভাবে এটা করতে হয়, যাতে সেটা পাঠকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।

প্রশ্নঃ কয়েক বছর আগে আপনার দেওয়া একটা সাক্ষাৎকারে অতীতে আপনি সাংবাদিক হিশেবে কতটা ক্ষিপ্র ছিলেন তা নিয়ে আপনাকে অবাক হতে দেখি ।

মার্কেজঃ উপন্যাস এবং সাংবাদিকতা, যেকোনটা লেখাই আমার কাছে এখন আগের থেকে বেশি কঠিন মনে হয়। যখন আমি সংবাদপত্রে কাজ করতাম, তখন আমার লেখা প্রতিটা শব্দ নিয়ে আমি এখনকার মত এত বেশি সচেতন থাকতাম না। বোগোতার ‘এল এস্পেকটাডোর’-এ কাজ করার সময় আমি প্রতি সপ্তাহে তিনটি প্রতিবেদন, প্রতিদিন দুই বা তিনটি সম্পাদকীয় নোট, আর সিনেমার রিভিউ লিখতাম। এরপর রাতের বেলায সবাই বাড়িতে চলে যাওয়ার পর আমি থেকে যেতাম উপন্যাস লেখার উদ্দেশ্যে। লিনোটাইপের (এক ধরণের টাইপরাইটার) কোলাহল আমার ভালো লাগতো, অনেকটা বৃষ্টির মতো শব্দ হতো এতে। এইসব শব্দের অনুপস্থিতিতে পূর্ণ নীরবতায় আমি কাজ করতে পারতাম না। এখন আমি তুলনামূলকভাবে অনেক কম লিখতে পারি। কাজ যেদিন একটু বেশি করা হয় সেরকম দিনেও সকাল নয়টা থেকে শুরু করে বিকাল দুইটা বা তিনটা পর্যন্ত আমি সর্বোচ্চ লিখতে পারি চার বা পাঁচ লাইনের একটা ছোট অনুচ্ছেদ, যা আবার পরের দিন সাধারণত আমি ছিঁড়ে ফেলি।

প্রশ্নঃ আপনার এই পরিবর্তন হওয়ার কারণ কী- আপনার কাজের উচ্চ প্রশংসা, নাকি কোন রাজনৈতিক অঙ্গীকার?

মার্কেজঃ দুটোই। আমার মনে হয়, এই যে আমি এত বেশি মানুষের জন্য লিখছি, যা ছিলো আমার কল্পনারও বাইরে, এটি এক ধরণের দায়িত্ববোধের জন্ম দেয় যার প্রকৃতি একইসাথে সাহিত্যিক এবং রাজনৈতিক। আগে যা লিখেছি তার চাইতে যাতে লেখার মান কমে না আসে, এই মনোভঙ্গি থেকে একটা গর্বও কাজ করে, তা বলতে বাধা নেই।

প্রশ্নঃ আপনি লেখা শুরু করেছেন কিভাবে?

মার্কেজঃ আঁকতে গিয়ে। মূলতঃ কার্টুন আঁকতে গিয়ে। পড়া বা লেখা শুরু করার আগে আমি বিদ্যালয়ে ও বাসায় কমিক আঁকতাম। এখন এটা অনুধাবন করে মজাই লাগে, যখন আমি উচ্চ বিদ্যালয়ে ছিলাম তখন লেখক হিশেবে আমার বেশ খ্যাতি ছিল, যদিও আমি তখন পর্যন্ত কিছুই লিখিনি। পুস্তিকা বা আবেদনপত্র লেখার দরকার হলে আমারই ডাক পড়তো, কারণ আমি পরিচিত ছিলাম ‘লেখক’ হিশেবে। যখন আমি কলেজে ভর্তি হলাম তখন দেখা গেলো আমার বন্ধুদের থেকে আমার সাহিত্যিক পরিচিতি অনেক বেশি। বোগোতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমার অনেক নতুন বন্ধু এবং জানাশোনা হলো, যারা আমাকে সমসাময়িক লেখকদের সাথে পরিচিত করালো। এক রাতে আমার এক বন্ধু আমাকে ফ্রানজ্ কাফকার ছোটগল্প পড়তে দিয়েছিলো। প্রথম লাইন পড়ে আমি এতটাই বিস্মিত হয়েছিলাম যে আমি বিছানা থেকে প্রায় পড়ে যাচ্ছিলাম। লাইনটা ছিল এরকম, “অস্বস্তিপূর্ণ স্বপ্ন থেকে সেই সকালে জেগে উঠার পর গ্রেগর সামসা তার বিছানায় নিজেকে আবিষ্কার করলো রূপান্তরিত এক বিশাল পতঙ্গ হিশেবে…”। যখন আমি লাইনটা পড়লাম তখন আমি ভাবছিলাম আমি জানতামই না এরকম কিছু লেখার স্বাধীনতা আছে কারও। যদি তা জানতাম, তাহলে অনেক আগে থেকেই আমি লেখা শুরু করতাম। সুতরাং আমি সাথে সাথেই ছোটগল্প লেখা শুরু করে দিলাম। সেগুলো সব ছিল বৌদ্ধিক ছোটগল্প, কারণ তখন আমি আমার সাহিত্য পাঠের অভিজ্ঞতা থেকে লিখছিলাম আর তখনও পর্যন্ত সাহিত্য আর জীবনের মধ্যকার সম্পর্কের সূত্র আমি আবিষ্কার করতে পারিনি। গল্পগুলি আমি বোগোতার ‘এল স্পেকটেডোর’-এর সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশ করেছিলাম। সেই সময়ে গল্পগুলো বেশ সফল হয়েছিলো- সম্ভবতঃ এর কারণ তখন কলম্বিয়ায় কেউ বৌদ্ধিক ছোটগল্প লিখছিলো না। তখন যা লেখা হতো, তাদের বেশির ভাগ ছিলো গ্রাম আর সমাজ জীবনের অভিজ্ঞতাকেন্দ্রিক। যখন আমি আমার প্রথম দিকের গল্পগুলো লিখছিলাম তখন বলা হয়েছিলো, এই গল্পগুলো জয়েসের প্রভাবাক্রান্ত।

প্রশ্নঃ ততদিনে কি আপনার জয়েস পড়া হয়েছিলো?

মার্কেজঃ আমি তখনও জয়েস পড়িনি, তাই আমি ‘ইউলিসিস’ পড়া শুরু করে দিলাম। শুধুমাত্র স্প্যানিশেই তখন এই উপন্যাসটা হাতের কাছে পেয়েছিলাম, তাই সেটাই পড়া হয়েছিলো। এরপর ইংরেজী এবং ভালো ফরাসী অনুবাদে ‘ইউলিসিস’ পড়ার পর আমি দেখলাম যে মূল স্প্যানিশ অনুবাদের মান ছিলো অসম্ভব খারাপ। কিন্তু আমি ওটা পড়ে আমার ভবিষ্যতের লেখালেখির জন্য একটা শিক্ষা পেয়েছিলাম- অভ্যন্তরীণ স্বগতোক্তির কৌশল। পরবর্তীতে ভার্জিনিয়া উলফ এর মধ্যেও আমি এই কৌশল দেখি; তিনি এই কৌশল যেভাবে ব্যবহার করেছেন সেটাকে আমার জয়েস এর থেকে উত্তম মনে হয়েছে। অবশ্য পরে আমি অনুধাবন করেছিলাম, অভ্যন্তরীণ স্বগতোক্তি মূলতঃ আবিষ্কার করেছিলেন ‘লাজারিলো দো টর্মেস’ বইটির অজ্ঞাতনামা লেখক।

প্রশ্নঃ প্রথমদিকে কোন লেখকদের দ্বারা আপনি প্রভাবিত হয়েছিলেন?

মার্কেজঃ বৌদ্ধিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমার ছোটগল্প লেখার প্রবণতা পরিহার করতে যারা আমাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছেন তারা হলেন আমেরিকার হারানো প্রজন্মের লেখকেরা। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, তাদের সাহিত্যের সাথে জীবনের একটা সম্পর্ক ছিল, যা আমার ছোটগল্পে ছিল না। এরপর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিলো যা আমার দৃষ্টিভঙ্গিকে বেশ প্রভাবিত করে। ঘটনাটি ছিলো ‘বোগোতাজো’: ১৯৪৮ এর ৮ এপ্রিল গাইতান নামে এক রাজনৈতিক নেতাকে গুলি করা হয়েছিলো আর বোগোতার মানুষ উন্মাদ হয়ে ভেঙ্গে পড়েছিলো রাস্তায়। যখন আমি খবরটি শুনি তখন আমি দুপুরের খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমি ঘটনাস্থলের দিকে দৌড়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু ততক্ষণে গাইতানকে একটি ট্যাক্সি করে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিলো। ঘরে ফেরার পথে আমি দেখলাম, জনতা ইতিমধ্যে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছে, দোকানপাট থেকে লুটপাট করছে, বাড়িঘর পোড়াচ্ছে। আমি তাদের সাথে যোগ দিলাম। সেই বিকালে এবং সন্ধ্যায় আমি বুঝতে পারলাম কোন ধরনের দেশে আমি বাস করছি আর আমার লেখা ছোটগল্পের সাথে এই বাস্তবতার মিল আসলে কতটা ক্ষীণ। যখন আমি আমার শৈশবের স্মৃতি বিজড়িত ক্যারিবিয়ান বারানকুইলাতে ফিরে যেতে বাধ্য হলাম, তখন আমি বুঝতে পারলাম এটাই সেই জীবন, যা আমি যাপন করেছি, যাকে আমি জানি, আর যার সম্পর্কে আমি লিখতে চাই। ১৯৫০ বা ’৫১ এর দিকে আরেকটা ঘটনা ঘটে যা আমার সাহিত্যিক প্রবণতাকে প্রভাবিত করে। আমার মা আমাকে তার সাথে আরাকাটাকাতে যেতে বলেন, যেখানে আমার জন্ম হয়েছিলো। আমরা সেখানে গিয়েছিলাম সেই বাড়িটা বিক্রি করে দেওয়ার জন্যে যেটাতে আমি আমার জীবনের প্রথম কিছু বছর কাটিয়েছিলাম। সেখানে পৌছে আমার প্রথমে খুব অস্বস্তি লাগছিলো, কারণ আমার বয়স তখন ছিল বাইশ আর আট বছর হওয়ার পর সেখানে আমার আর যাওয়া হয়নি। সেখানকার সবকিছুই অপরিবর্তিত ছিল, কিন্তু আমার মনে হচ্ছিলো আমি আসলে এই গ্রামটিকে দেখছি না, বরং আমার মনে হচ্ছিলো আমি গ্রামটিকে পড়ছি। যেন আমি যা দেখছি সবকিছুই ইতিমধ্যে লেখা হয়ে গেছে আর আমার একমাত্র কাজ হলো কোথাও বসে আমি যা পড়ছি তা নকল করে ফেলা, মানে লিখে ফেলা। বাস্তবে যেন সবকিছুই বিবর্তিত হয়ে গিয়েছিলো সাহিত্যে: বাড়িঘর, মানুষজন, এমনকি স্মৃতিরাও। আমি নিশ্চিত নই আমি ততদিনে ফকনার পড়েছিলাম কি না, কিন্তু আমি এখন জানি যে তখন আমি যা দেখছিলাম তা ফকনারের কৌশলের মত কিছু একটার মাধ্যমেই আমাকে লিখতে হতো। গ্রামটির পরিবেশ, এর অবক্ষয়, তীব্র তাপ এসবকিছুকে আমি অনুভব করছিলাম যেভাবে আমি অনুভব করেছিলাম ফকনারকে। ফলের কোম্পানিতে কাজ করা অনেক আমেরিকান দ্বারা অধ্যূষিত এই অঞ্চলটি ছিল কলা চাষের একটি কেন্দ্র, যার পরিবেশের সাথে আমেরিকার দূর দক্ষিণের লেখকদের পরিবেশের বেশ মিল ছিল। সমালোচকেরা আমার মধ্যে ফকনারের প্রভাবের কথা বলেছেন, আমার কাছে পুরো ব্যাপারটিকেই দৈব মনে হয়ঃ আমি আসলে এমন কিছু উপাদান খুঁজে পেয়েছিলাম যাদেরকে নিয়ে কাজ করতে হলে সেটা ফকনার যেভাবে করেছেন, সেভাবেই করার দরকার ছিল। আমার সেই ছোটবেলার গ্রামটির ভ্রমণপর্ব শেষে ফিরে এসে আমি আমার প্রথম উপন্যাস ‘লিফ স্টর্ম’ লিখলাম। আরাকাটাকা ভ্রমণের পর আমি ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলাম, আমার শৈশবে যা কিছু ঘটেছে সেসবের একটা সাহিত্যিক মূল্য আছে। লিফ স্টর্ম লেখার মুহূর্ত থেকে আমি এটা বুঝতে পেরেছিলাম, আমি লেখক হতে চাই, কারও পক্ষেই এ কাজ থেকে আমাকে নিবৃত্ত করা সম্ভব না আর আমার করার মত কাজ শুধু একটাই আছে- বিশ্বের শ্রেষ্ঠ লেখক হওয়ার চেষ্টা করা। এটা ১৯৫৩ সালের কথা, কিন্তু আমার এ যাবৎকাল প্রকাশিত আটটার মধ্যে পাঁচটা বই লেখার আগ পর্যন্ত আমি কোন সম্মানী পাইনি; সেটা ১৯৬৭ সালের কথা।

প্রশ্নঃ আপনি কি মনে করেন তরুণ লেখকদের মধ্যে তাদের শৈশব ও জীবন-অভিজ্ঞতার মূল্য অস্বীকার করা এবং শুরুতে আপনি যেভাবে বৌদ্ধিকভাবে চিন্তা করেছেন সেভাবে চিন্তা করার প্রবণতা বেশ ভালোভাবেই কাজ করে?

মার্কেজঃ না, আদতে আসলে এই প্রক্রিয়ার উল্টোটাই হয়, কিন্তু আমাকে যদি কোন তরুণ লেখককে উপদেশ দিতে বলা হয়, তাহলে আমি বলবো তার এমন কিছুই লেখা উচিত, যার অভিজ্ঞতা তার আছে; এটা খুব সহজেই বুঝা যায় যে লেখক তার অভিজ্ঞতা থেকে লিখছে নাকি এমন কিছু নিয়ে লিখেছে যা সে পড়েছে অথবা যার সম্পর্কে সে শুনেছে। পাবলো নেরুদার একটি কবিতায় এরকম একটা চরণ আছে, “ঈশ্বর আমাকে গান গাওয়ার সময় কোন কিছু উদ্ভাবন করা থেকে বিরত রাখুন”। এটা দেখে আমি আমোদিত হই যে আমার কাজের সবচেয়ে বড় প্রশংসা আমি পাই কল্পনাশক্তির জন্যে যেখানে সত্যিটা হচ্ছে আমার কাজে এমন কোন লাইন নেই যার কোন বাস্তব ভিত্তি নেই। সমস্যা হচ্ছে ক্যারিবীয় বাস্তবতা সুদূর কল্পনার চেয়ে কোনঅংশেই কম নয়।

প্রশ্নঃ এই সময়ে আপনি লিখছিলেন কাদের জন্য? আপনার পাঠক কারা ছিল?

মার্কেজঃ লিফ স্টর্ম লেখা হয়েছিলো আমার বন্ধুদের জন্যে যারা আমাকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছিলো, তাদের বই আমাকে পড়ার জন্যে ধার দিয়েছিলো, আর আমার কাজের ব্যাপারে ছিল ব্যাপক উৎসাহী। আমি মনে করি, আপনি যখন লিখেন, তখন তা কাওকে উদ্দেশ্য করেই লিখেন। যখন আমি লিখি তখন আমার সবসময়ই মনে হতে থাকে যে আমার অমুক বন্ধু এই অংশ পছন্দ করবে, অথবা অন্য একজন বন্ধু ওই অনুচ্ছেদ বা অধ্যায়টি পছন্দ করবে। সবসময়ই মাথায় কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তির ব্যাপারে এরকম চিন্তাটা থাকে। শেষ পর্যন্ত আপনি সবকিছুই লিখেন আপনার বন্ধুদের জন্যে। ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অভ সলিচিউড’ লেখার পর সমস্যাটা হয়েছে এই যে, এখন আমি আর জানি না এত হাজার হাজার পাঠকের মধ্যে আমি আসলে লিখছি ঠিক কার জন্যে; এটা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে এবং একরকম বাধাও দেয়। যেন হাজার হাজার চোখ আপনার দিকে তাকিয়ে আছে আর আপনি আসলে জানেন না তারা ঠিক কী চিন্তা করছে।

প্রশ্নঃ আপনার কথাসাহিত্যে সাংবাদিকতার প্রভাব কেমন?

মার্কেজঃ আমি মনে করি আমার ক্ষেত্রে এদের প্রভাব পারস্পরিক। কথাসাহিত্য আমার সাংবাদিকতাকে সহায়তা করেছে কারণ প্রথমটি দ্বিতীয়টিকে সাহিত্যিক মূল্য দিয়েছে। অন্যদিকে সাংবাদিকতা আমার কথাসাহিত্যকে সাহায্য করেছে কারণ সাংবাদিকতার মাধ্যমে আমি বাস্তবতার সাথে একটি গভীর সম্পর্ক ধরে রাখতে পেরেছি।

প্রশ্নঃ ‘লিফ স্টর্ম’ লেখার পর হতে ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অভ সলিচিউড’ লিখতে পারার আগ পর্যন্ত আপনার নিজস্ব ভাষাশৈলীর বিবর্তন এবং পরিণতির ইতিহাসটি কিরকম?
মার্কেজঃ ‘লিফ স্টর্ম’ লেখার পর আমি নিশ্চিত হয়েছিলাম, আমার গ্রাম এবং শৈশব নিয়ে লেখার মাধ্যমে আমি আমার দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে চিন্তা করা এবং তা নিয়ে লেখার দায়বদ্ধতা থেকে পালাতে পারি। রাজনৈতিক যেসব ব্যাপার তখন ঘটছিলো সেসব থেকে পালাতে গিয়ে আমি এহেন স্মৃতিকাতরতার পেছনে লুকিয়ে একটা ভুল প্রতীতিতে ছিলাম। এটি ছিল সেই সময় যখন সাহিত্য এবং রাজনীতির মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে প্রচুর আলোচনা হচ্ছিল। আমি দুটোর মধ্যে শূন্যস্থান কমানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। আমার পূর্বতন প্রভাব ছিল ফকনার; তখন তা হয়ে গেলো হেমিংওয়ে। আমি তখন লিখেছিলাম ‘নো ওয়ান রাইটস টু কর্নেল’, ‘ইন ইভিল আওয়ার’, এবং ‘বিগ মামা’স ফিউনারেল’। এগুলো প্রায় একই সময়ে লেখা হয়েছিলো আর বিষয়বস্তুর দিক থেকেও এদের বেশ ভালোই মিল ছিলো। ‘লিফ স্টর্ম’ এবং ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অভ সলিচিউড’ এর কাহিনী যে গ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিলো, এই উপন্যাসগুলোর ঘটনাস্থল ছিলো তা থেকে ভিন্ন। এদের কাহিনী ঘটেছিলো এমন একটি গ্রামে, যেখানে কোন জাদুর অস্তিত্ব নেই। এটাকে সাংবাদিকতাধর্মী সাহিত্য বলা যায়। কিন্তু যখন আমি ‘ইন ইভিল আওয়ার’ লিখলাম তখন দেখলাম যে আমার ‍দৃষ্টিভঙ্গিতে আবার একটা ভুল হচ্ছে। আমি বুঝতে পারলাম, আমার শৈশবকে ভিত্তি করে যে লেখাগুলো আমি লিখেছি তারা আদতে অনেক বেশি রাজনৈতিক আর আমার দেশের বাস্তবতার সাথে এদের মিল আমার ধারণার থেকেও ঢের বেশি। ইভিল আওয়ার এর পর পাঁচ বছর আমি আর কিছু লিখিনি। আমি কী করতে চাচ্ছিলাম সেটার একটা ধারণা আমার ছিল, কিন্তু কিছু একটা বাকি রয়ে যাচ্ছিলো যেটা সম্পর্কে আমি নিশ্চিত হতে পারছিলাম না ঠিক সেই দিন পর্যন্ত যে দিন আমি আমার সঠিক প্রকাশভঙ্গিটিকে খুঁজে পেলাম- যে ভঙ্গিটি আমি ব্যবহার করেছি ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অভ সলিচিউড’-এ। এই ভঙ্গিটিকে আমি গড়ে তুলেছি আমার ঠাকুরমার গল্প বলার ভঙ্গির উপর নির্ভর করে। তার গল্পের বিষয়বস্তু ছিল অলৌকিক এবং আজগুবী, কিন্তু তিনি তা বলতেন খুব স্বাভাবিকভাবে। যখন আমি আমার লেখার এই ভঙ্গিটিকে শেষ পর্যন্ত খুঁজে পেলাম, তখন টানা আঠারো মাস আমি এটি নিয়ে কাজ করে গিয়েছিলাম।

প্রশ্ন: কিভাবে আপনার ঠাকুরমা আজগুবি ঘটনাগুলোকে স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ করতে পারতেন?

মার্কেজঃ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার মুখের অভিব্যক্তি। গল্প বলার সময় তার অভিব্যক্তি একটু্ও পালটাতো না, যেটাতে সবাই খুব অবাক হতো। এর আগে যতবারই আমি ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অভ সলিচিউড’ লেখার চেষ্টা করি, প্রতিবারই গল্পটিতে বিশ্বাস না রেখেই তা লিখতে চেয়েছি। পরে আবিষ্কার করলাম, আমি যা বলতে যাচ্ছি তার উপর আমার নিজের বিশ্বাস থাকতে হবে আর লিখতে হবে ঠিক ওইভাবে যেভাবে আমার ঠাকুরমা তার গল্প বলতেন: ইটের চেহারার মতো অভিব্যক্তিতে।

প্রশ্নঃ এই কৌশল বা ভঙ্গিটির একটি সাংবাদিকতাধর্মী বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। আপনি আপাতঃ আজগুবি ঘটনা এত খুঁটিনাটি সহ বর্ণণা করেন যে এতে এই ঘটনারাও একটা নিজস্ব বাস্তবতা পায়। এটা কি আপনি সাংবাদিকতা থেকে শিখেছেন?

মার্কেজঃ এটা একটা সাংবাদিকতার কৌশল যা আপনি সাহিত্যেও প্রয়োগ করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনি বলেন আকাশে হাতি উড়ছে, কেউ আপনাকে বিশ্বাস করবে না। কিন্তু যদি আপনি বলেন চারশো পঁচিশটি হাতি আকাশে উড়ছে, তাহলে মানুষ হয়তো আপনাকে বিশ্বাস করতেও পারে। ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অভ সলিচিউড’-এ এই ধরনের অনেক দৃষ্টান্ত আছে। এই কৌশলটাই আমার ঠাকুরমাও প্রয়োগ করতেন। আমি বিশেষ করে সেই গল্পটা মনে করতে পারি যেখানে হলুদ প্রজাপতিরা গল্পের একটি চরিত্রকে ঘিরে রাখে। যখন আমি খুব ছোট ছিলাম তখন আমাদের বাসায় একজন বিদ্যুৎমিস্ত্রী আসতেন। তার ব্যাপারে আমার খুব আগ্রহ ছিল কারণ তিনি বৈদ্যুতিক খুটিঁর সাথে একটি বেল্টের মাধ্যমে নিজেকে ঝুলিয়ে রাখতেন। ওই লোকটা যখনই আসতেন আমার ঠাকুরমা বলতেন, তিনি পুরো ঘরে প্রজাপতি ছড়িয়ে যাবেন। কিন্তু এই ঘটনাটা লেখার সময় আমি আবিষ্কার করলাম, প্রজাপতিরা হলুদ এটা যদি আমি না বলি তাহলে লোকে আমার কথা বিশ্বাস করবে না। রেমেডিওস দ্য বিউটি’র স্বর্গে যাওয়ার পর্বটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে লেখার জন্য আমাকে প্রচুর সময় নিতে হয়েছে। একদিন বাগানে ঘুরার সময় আমাদের বাসায় কাপড় ধোয়ার কাজ করতে আসা এক মহিলাকে আমি প্রচন্ড বাতাসের মধ্যে কাপড় শুকাতে দিতে দেখেছিলাম। তিনি কাপড় উড়িয়ে না দেওয়ার জন্য বাতাসের সাথে ঝগড়া করছিলেন। আমি আবিষ্কার করলাম, এই কাপড়গুলোকে যদি আমি রেমেডিওস দ্য বিউটি হিশেবে চিন্তা করি, তাহলে তার স্বর্গারোহণ সহজ হয়। ঠিক এভাবেই আমি এই গল্পটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলি। বিশ্বাসযোগ্যতা প্রত্যেক লেখকেরই মৌলিক সমস্যা। যে কেউ যে কোন কিছু নিয়ে লিখতে পারে যতক্ষণ পর্যন্ত সেই ঘটনাকে লেখক বিশ্বাসযোগ্য হিশেবে উপস্থাপন করতে পারছে।

প্রশ্নঃ ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অভ সলিচিউড’ এর অনিদ্রা মহামারীর উৎস কী?

মার্কেজ: ইউদিপাস থেকে শুরু করে আমি সবসময়ই মহামারীতে আগ্রহী ছিলাম। মধ্যযুগের মহামারী সম্পর্কে আমি ব্যাপক পড়াশোনা করেছি। ড্যানিয়েল ডিফো’র ‘দ্য জার্নাল অভ দ্য প্লেগ ইয়্যার’ আমার খুব প্রিয় একটি বই; এটি প্রিয় হওয়ার অন্যান্য কারণের সাথে এটিও আছে, ডিফো একজন সাংবাদিক যার ভাষার মধ্যে প্রকৃত কল্পকাহিনীর একটা সুর পাওয়া যায়। অনেক বছর ধরে আমার ধারণা ছিলো, ডিফো লিখেছিলেন তার দেখা লন্ডন মহামারীকে নিয়ে। কিন্তু পরে আমি আবিষ্কার করলাম, এটি একটি উপন্যাস, কারণ লন্ডনে যখন মহামারীটি হয়েছিলো তখন ডিফোর বয়স ছিলো সাত বছরেরও কম। আমার লেখার বিষয়ের মধ্যে মহামারী ঘুরেফিরে এসেছে, যদিও বিভিন্ন রূপে। ‘ইভিল আওয়ার’-এ প্রচারপত্ররা এসেছে মহামারী রূপে। অনেক বছর ধরে আমার মনে হয়েছিলো, কলম্বিয়ার রাজনৈতিক সহিংসতার দর্শন মহামারীর মতো। ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অভ সলিচিউড’ এর আগে ‘ওয়ান ডে আফটার স্যাটারডে’ গল্পে সব পাখি মেরে ফেলার জন্য আমি একটা মহামারীকে নিয়ে এসেছিলাম। ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অভ সলিচিউড’-এ অনিদ্রার মহামারীকে আমি একটা সাহিত্যিক কৌশল হিশেবে ব্যবহার করেছি, যেহেতু এটিকে নিদ্রার মহামারীর বিপরীত বলা যায়। চূড়ান্তভাবে, সাহিত্য কাঠমিস্ত্রীর কাজ বই আর কিছু তো নয়।

প্রশ্নঃ আপনি কি এই উপমাটি আরেকটু ব্যাখ্যা করবেন?

মার্কেজঃ দুটোই খুব কঠিন পরিশ্রমের কাজ। কোনকিছু লেখা টেবিল বানানোর মতোই কঠিন। দুটোর ক্ষেত্রেই আপনাকে বাস্তবতা নিয়ে কাজ করতে হয়; যে বিষয়টি নিয়ে আপনি কাজ করছেন সেটি কাঠের মতোই শক্ত। দুটোরই প্রচুর কলাকৌশল আছে। মূলতঃ এখানে ভোজবাজির পরিমাণ কম কিন্তু কঠোর পরিশ্রমের প্রয়োজন অনেক বেশি। সম্ভবত প্রুস্ত-ই বলেছিলেন, এই কাজে দরকার হয় দশ ভাগ অনুপ্রেরণা আর নব্বই ভাগ ঘাম। আমি কখনোই কাঠমিস্ত্রির কাজ করিনি, কিন্তু এই কাজটিকেই আমি সবচেয়ে সপ্রশংস দৃষ্টিতে দেখি, কারণ মূলতঃ কাঠমিস্ত্রি ছাড়া এই কাজ আপনার জন্য আর কেউ কখনোই করে দিবে না।

প্রশ্নঃ ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অভ সলিচিউড’ এর কলা-জ্বর এর ব্যাপারটি কী? ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি বাস্তবে যা করেছিলোতার সাথে এই কাহিনীর মিল কতটুকু?

মার্কেজঃ কলা-জ্বর এর ঘটনাটির সাথে বাস্তবতার সম্পর্ক খুব গভীর।অবশ্যই আমি এখানে ঐতিহাসিকভাবে অপ্রমাণিত এরকম কিছু ঘটনার উপর সাহিত্যিক কৌশল প্রয়োগ করেছি। উদাহরণস্বরূপ, স্কয়্যার-এ সংঘটিত গণহত্যার ঘটনাটি সর্ম্পূণ সত্য; কিন্তু,যদিও আমি প্রমাণাদি এবং কাগজপত্রের উপর ভিত্তি করে এই ঘটনাটা লিখেছি, এই ঘটনায় ঠিক কয়জন মানুষ মারা গিয়েছিলো তা কখনোই জানা যায়নি। আমার লেখা তিন হাজার সংখ্যাটি অবশ্যই অতিরঞ্জিত। কিন্তু আমার একটি শৈশবস্মৃতির কথা মনে পড়ে, যেখানে একটি বাগান থেকে কলাভর্তি একটি বিশাল বড় রেলগাড়িকে চলে যেতেদেখি।হতে পারে এখানে তিন হাজার মৃত মানুষ ছিলো, যাদেরকে পরবর্তীতে নিক্ষেপ করা হয়েছিলো সাগরে। অবাক করার ব্যাপার হচ্ছে, এখন কংগ্রেস আর সংবাদপত্রে তিন হাজার সংখ্যাটিকে বেশ স্বাভাবিকভাবেই উল্লেখ করা হয়। আমার সন্দেহ, আমাদের ইতিহাসের অর্ধেক ঘটনা এভাবেই তৈরী হয়েছে। ‘দ্য অটাম অভ দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’-এ একনায়ক বলেন বর্তমানের জন্য এই ঘটনার সত্যি হওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ ভবিষ্যতে কোন এক সময়ে এটিই সত্যি-তে পরিণত হবে। আগে অথবা পরে মানুষ সরকার অপেক্ষা লেখকদেরকেই বেশি বিশ্বাস করে।

প্রশ্নঃ এটা লেখককে অনেক শক্তিশালী করে তোলে, তাই নয় কি?

মার্কেজঃ হ্যাঁ, এবং এটা আমি বুঝতেও পারি। এটা আমাকে একটা বিশাল দায়িত্বের ভার দেয়। আমি আসলে যেটা করতে চাই সেটা হলো এমন একটা সাংবাদিকতাধর্মী কাজ যেটা সম্পূর্ণ সত্যি এবং বাস্তব হবে, কিন্তু যেটা শোনাবে ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অভ সলিচিউড’ এর মতো কাল্পনিক। যত বেশি আমি বাঁচছি আর অতীতকে স্মরণ করছি, ততই আমার মনে হচ্ছে সাহিত্য আর সাংবাদিকতা গভীরভাবে সম্পর্কিত।

প্রশ্নঃ ‘দ্য অটাম অভ প্যাট্রিয়ার্ক’-এ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের জন্য একটি দেশের সমুদ্র দান করে দেয়ার বিষয়ে কিছু বলবেন কি?

মার্কেজঃ এটা কিন্তু আসলেই ঘটেছিলো। এমনকি এই ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতেও অনেক বার ঘটবে। ‘দ্য অটাম অভ দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’ সম্পূর্ণরূপে একটি ঐতিহাসিক বই। বাস্তব ঘটনা থেকে সম্ভাব্য ঘটনা খুঁজে বের করা সাংবাদিক আর ঔপন্যাসিকের কাজ, কাজটি পয়গম্বরেরও বটে। সমস্যা হলো অনেকেই মনে করেন আমি কল্পনামিশ্রিত কাহিনীর লেখক, কিন্তু আদতে আমি খুব বস্তুবাদী একজন মানুষ আর আমি যা লিখি তাই আমার মতে প্রকৃত সমাজতান্ত্রিক বস্তুবাদ।

প্রশ্নঃ একে কি ইউটোপীয় বলা যায়?

মার্কেজঃ আমি নিশ্চিত নই ইউটোপীয় দিয়ে আসলে কী বুঝায়- বাস্তব, নাকি, আদর্শ। কিন্তু আমার মনে হয়,আমি যা লিখি তাকে বাস্তব অর্থে ইউটোপীয় বলা যায়।

প্রশ্নঃ ‘দ্য অটাম অভ দ্য প্যাট্রিয়ার্ক’ এর চরিত্ররা, যেমন ধরা যাক এই উপন্যাসের একনায়কেরা, কি বাস্তব মানুষের উপর ভিত্তি করে তৈরী? ফ্রাঙ্কো, পেরন ও ট্রুজিলোর সাথে এদের বেশ মিল পাওয়া যায়।

মার্কেজঃ প্রতিটি উপন্যাসেই চরিত্ররা হচ্ছে কোলাজ এর মতোঃ বিভিন্ন চরিত্রের সমন্বয়ে একটি কোলাজ, যাদের আপনি জানেন, বা যাদের সম্পর্কে শুনেছেন, বা যাদের সম্পর্কে আপনি পড়েছেন। আমি গত শতাব্দী এবং এই শতাব্দীর শুরুর দিকের ল্যাটিন আমেরিকার একনায়কদের সম্পর্কে যেখানে যা পেয়েছি তার সবই পড়েছি। এই একনায়কদের অধীনে বেঁচে ছিলেন এমন অনেকের সাথে আমি কথাও বলেছি। অন্ততঃ দশ বছর ধরে আমি এসব করেছি। এইসব পড়ার পর যখন চরিত্রটি কেমন হবে সেটা সম্পর্কে আমার একটি স্পষ্ট ধারণা হয়ে গেলো, তখন আমি যা কিছু পড়েছি শুনেছি তার সবকিছুই ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, যাতে বাস্তব জীবনে ঘটা যেকোন পরিস্থিতিকে ছাড়িয়ে আমি নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারি। একটা সময় আমি অনুধাবন করলাম, আমি নিজেই তো কখনো কোন একনায়কের অধীনে বাস করিনি; তাই আমার মনে হলো যদি আমি বইটি স্পেনে বসে লিখি, তাহলে একনায়কতন্ত্রের মধ্যে থাকার পরিবেশ সম্পর্কে আমি জানতে পারবো। কিন্তু আমি দেখলাম, ফ্রাঙ্কোর স্পেন থেকে ক্যারিবিয়ার একনায়কন্ত্র অনেক বেশি আলাদা। এইসব কারণে বইটি লেখার কাজ প্রায় এক বছর ধরে থেমে ছিলো। বইটিতে কিছু একটার অনুপস্থিতি আমি টের পাচ্ছিলাম কিন্তু নিশ্চিত হতে পারছিলাম না সেটি কী। এরপর রাতারাতি আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, সবচেয়ে ভালো হয় যদি আমি আবার ক্যারিবিয়ায় ফিরে আসি। সুতরাং আমরা সবাই কলম্বিয়ার বারানকুইলাতে ফিরে আসলাম। ফিরে আসার পর সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে আমি একটি বিবৃতি দিয়েছিলাম যেটাকে তারা কৌতুক হিশেবে নিয়েছিলেন। তাদেরকে আমি বলেছিলাম, আমি ফিরে এসেছি কারণ পেয়ারার গন্ধ কেমন সেটা আমি ভুলে গেছি। সত্যি বলতে, আমার বইটা শেষ করার জন্যে এটা জানাই আমার দরকার ছিলো। আমি ক্যারিবিয়ান জুড়ে ঘুরে বেড়ালাম। দ্বীপ থেকে দ্বীপান্তরে ভ্রমণ করতে গিয়ে আমি সেই সব উপাদানগুলোকে খুঁজে পেলাম, যাদেরকে ছাড়া আমার উপন্যাসটি সম্পূর্ণ হতে পারছিলো না।

প্রশ্নঃ আপনি প্রায়ই ক্ষমতার নিঃসঙ্গতাকে আপনার লেখার বিষয় হিশেবে ব্যবহার করেন।

মার্কেজঃ আপনার ক্ষমতা যত বেশি হবে, তত বেশি আপনার জন্য এটি জানা কঠিন হয়ে পড়বে যে কারা আপনার সাথে মিথ্যে বলছে আর কারা বলছে না। যখন আপনি সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হবেন, তখন আপনার সাথে বাস্তবতার আর কোন যোগাযোগ থাকবে না, আর এটিই হচ্ছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট নিঃসঙ্গতা। একজন খুব ক্ষমতাধর লোক, একজন একনায়ক, এমন সব স্বার্থ আর মানুষদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকেন যাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকে তাকে বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা; সবাই তাকে নিঃসঙ্গ করে রাখার ব্যাপারে একজোট।

প্রশ্নঃ লেখকদের নিঃসঙ্গতাবোধ কি অন্যরকম?

মার্কেজঃ ক্ষমতার যে নিঃসঙ্গতাবোধ, তার সাথে এর অনেক মিল আছে। লেখকদের বাস্তবতাকে চিত্রিত করার চেষ্টা প্রায়ই বাস্তবতার একটা বিকৃত রূপে পরিণত হয়। বাস্তবতাকে পরিবর্তন করতে গিয়ে তারা অনেক সময় প্রকৃত বাস্তবতা থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যান, নিমজ্জিত হন আইভরি টাওয়ারে। সাংবাদিকতা এই প্রবণতার বিরুদ্ধে বেশ ভালো একটিপ্রহরার কাজ করতে পারে। এই কারণে আমি সবসময় সাংবাদিকতায় যুক্ত থাকতে চেষ্টা করেছি, কারণ এটি আমাকে বাস্তব পৃথিবী বিশেষ করে রাজনৈতিক সাংবাদিকতা আর রাজনীতির সাথে সংযোগ রাখতে সাহায্য করে। ও.হা.ই.অ.স এর পর যে নিঃসঙ্গতাবোধ আমাকে ভীত করেছিলো, তা ঠিক লেখকের নিঃসঙ্গতাবোধ নয়; এটা ছিলো খ্যাতির নিঃসঙ্গতা, যা ক্ষমতার নিঃসঙ্গতাবোধের সাথে অনেক বেশি সম্পর্কিত। আমার বন্ধুরা আমাকে সেই বোধ থেকে রক্ষা করেছে, আমার সেই বন্ধুরা যাদেরকে আমি সবসময়ই কাছে পেয়েছি।

প্রশ্নঃ কিভাবে?

মার্কেজঃ কারণ আমি সারা জীবন একই বন্ধুদের ধরে রাখতে পেরেছি। আমি বলতে চাচ্ছি আমি আমার পুরোনো বন্ধুদের সাথে কখনোই বিচ্ছিন্ন হইনি, আর তারাই আমাকে সবসময় মাটির পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনেছে; তাদের পা সবসময় মাটিতেই থাকে। তাছাড়া, তারা কেউই বিখ্যাত নয়।

প্রশ্নঃ নতুন কোন লেখার প্রক্রিয়ার শুরুটা আসে কীভাবে? দ্য অটাম অভ দ্য প্যাট্রিয়ার্ক এ প্রাসাদের গরুরা ঘুরেফিরে আসে। শুরুতে এর চিত্র কি এরকমই ছিলো?

মার্কেজঃ আমার একটা আলোকচিত্রের বই আছে যেটা আমি আপনাকে দেখাবো। আমি বিভিন্ন সময়ে বলেছি, আমার বইদের জন্মবৃত্তান্তে সবসময়ই একটি ছবি বা চিত্র থাকে। দ্য অটাম অভ প্যাট্রিয়ার্ক এর প্রথম চিত্রটি ছিলো এরকমঃ একটি বেশ বিলাসবহুল প্রাসাদে একজন খুব বুড়ো লোক, আর প্রাসাদটিতে গরু এসে প্রাসাদের পর্দা খেয়ে ফেলছে। কিন্তু এই চিত্রটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে আসতে পারেনি যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি একটি আলোকচিত্র দেখলাম। রোমে একটি বইয়ের দোকানে আমি আলোকচিত্রের বই দেখা শুরু করেছিলাম। এখানে বলে রাখা যায়, আলোকচিত্রের বই আমি সংগ্রহ করতে পছন্দ করি। আমি সেখানে একটি নিখুঁত আলোকচিত্র দেখেছিলাম। আমি স্পষ্ট দেখলাম, বইটি কিভাবে এগোতে যাচ্ছে। যেহেতু আমি বড় বুদ্ধিজীবী গোছের কেউ নই, সেহেতু আমি আমার মোটিফ নৈমিত্তিক জিনিস বা জীবনের মধ্যেই খুঁজে পাই, কোন মাস্টারপিসের মধ্যে না।

প্রশ্নঃ আপনার উপন্যাসেরা কি কখনও অপ্রত্যাশিত বাঁক নেয়?

মার্কেজঃ প্রথমদিকে এরকমটি হতো। আমার লেখা প্রথম দিকের গল্পগুলোতে আমি গল্পের মেজাজ কী হবে তার একটা সাধারণ ধারণা নিয়ে এগোতাম, কিন্তু গল্পের ঘটনাচক্র আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতো। যেহেতু তখন আমি তরুণ ছিলাম, আর তরুণদের অনুপ্রেরণার কোন অভাব কখনোই হয় না, সেহেতু এইভাবে লেখার মধ্যে আসলে কোন সমস্যা নেই – সেই সময়গুলোতে আমার জন্য এটিই ছিলো শ্রেষ্ঠ পরামর্শ। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও আমাকে বলা হয়েছিলো, যদি আমি লেখার কলাকৌশল আয়ত্ত করতে না পারি, তাহলে পরবর্তীতে আমাকে ঝামেলায় পড়তে হবে, যখন অনুপ্রেরণা ফুরিয়ে যাবে আর এর ক্ষতিপূরণ হিশেবে শুধুমাত্র কলাকৌশলের উপর নির্ভর করতে হবে। যদি আমি তখন এটি না শিখতাম, তাহলে এখন আমার পক্ষে আগে থেকে লেখার একটা কাঠামো দাঁড় করানো কোনভাবেই সম্ভব হতো না। কথাসাহিত্যের কাঠামো একটি নির্ভেজাল কৌশলগত সমস্যা আর যদি আপনি এটিকে প্রথমেই শিখে না ফেলেন তাহলে কখনোই আপনি তা শিখতে পারবেন না।

প্রশ্নঃ নিয়মানুবর্তিতা তাহলে আপনার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ?

মার্কেজঃ আমার মনে হয় না অসাধারণ নিয়মানুবর্তিতার অভ্যাস করা ছাড়া কারো পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ কিছু লেখা সম্ভব।

প্রশ্নঃ কৃত্রিম উদ্দীপকদের সম্বন্ধে আপনার মতামত কী?

মার্কেজঃ হেমিংওয়ের একটা কথা আমার বেশ পছন্দ হয়েছিলো। তিনি বলেছিলেন, তার জন্য লেখা হচ্ছে মুষ্টিযুদ্ধের মতো। তিনি তার শরীরের যত্ন নিতেন। ফকনারের খ্যাতি ছিলো পাঁড় মাতাল হিশেবে, কিন্তু যত সাক্ষাৎকার তিনি দিয়েছেন তার প্রতিটিতেই তিনি বলেছেন মাতাল অবস্থায় এক লাইন লেখাও অসম্ভব। হেমিংওয়েও এটা বলেছিলেন। অনেক অপকৃষ্ট পাঠকেরা আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন আমার কোন কাজ আমি মাদাকাসক্ত অবস্থায় করেছি কী না। এই ধরনের প্রশ্ন আসলে প্রমাণ করে যে সাহিত্য বা মাদক কোনটা সম্পর্কেই এই ধরনের পাঠকের কোন ধারণা নেই। ভালো লেখক হওয়ার জন্য আপনাকে প্রতিটা মুহূর্তেই পুরোপুরি সুস্থ এবং স্বাভাবিক থাকতে হবে। আমি লেখালেখি সম্পর্কিত ভাবপ্রবণ ধারণার তীব্র বিরোধী, যে ধারণা অনুযায়ী লেখালেখিকে দেখা হয় আত্মোৎসর্গ হিশেবে, আর মনে করা হয় অর্থনৈতিক বা মানসিক অবস্থা যত খারাপ হবে, লেখালেখির মান ততোই ভালো হবে। আমি মনে করি, লেখক হওয়ার জন্য আপনার অবশ্যই খুব ভালো আত্মিক এবং শারীরিক অবস্থায় থাকা জরুরী। সাহিত্য সৃষ্টির জন্য সুস্বাস্থ্য আমার কাছে অপরিহার্য, আর ‘হারানো প্রজন্ম’ এর সাহিত্যিকেরা এটা বুঝতে পেরেছিলো। তারা জীবনকে ভালোবাসতো।

প্রশ্নঃ ব্লেইস সেন্ডারস বলেছেন, বেশির ভাগ কাজের তুলনায় লেখালেখি অনেক বেশি সুবিধাজনক, এবং লেখকেরা তাদের দুর্দশাকে আদতে অনেক বাড়িয়ে দেখান। এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?

মার্কেজঃ আমি মনে করি লেখালেখি বেশ কঠিন একটি কাজ, কিন্তু যত্নসহ করতে গেলে যেকোন কাজই তো কঠিন। এক্ষেত্রে সুবিধাজনক কাজ সেটিকেই বলা যায়, যা করে আপনি নিজে সন্তুষ্ট থাকবেন। আমার মনে হয় আমি নিজের এবং অন্যদের ব্যাপারে অনেক বেশি খুঁতখুঁতে, কারণ আমি ভুল একদমই সহ্য করতে পারি না; নিখুঁতভাবে কিছু করতে পারাটাকেই আমার একটা বিশেষ সুবিধা বলে মনে হয়। অবশ্য এটা সত্যি যে লেখকদের বড় কিছু করার প্রতি এক ধরনের মোহ থাকে আর তারা নিজেদেরকে মহাবিশ্ব এবং সমাজের বিবেকের কেন্দ্রে দেখতে পছন্দ করেন। কিন্তু আমার শ্রদ্ধা সবচেয়ে বেশি সেসব কাজের জন্য, যেসব কাজ ভালোভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। ভ্রমণ করার সময় এটা জেনে আমি সবসময়ই সুখী হই যে আমি যতটা ভালো লেখক তার থেকে বৈমানিকরা আরও ভালো বৈমানিক।

প্রশ্নঃ কোন সময়ে আপনি সবচেয়ে ভালোভাবে কাজ করতে পারেন? আপনার কি কোন কর্মপরিকল্পনা আছে?

মার্কেজঃ যখন আমি পেশাদার লেখকে পরিণত হলাম, তখন আমার জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল আমার কর্মপরিকল্পনা ঠিক করা। সাংবাদিক হওয়ার মানে হলো আপনাকে রাতে কাজ করতে হবে। চল্লিশ বছর বয়সে যখন আমি পূর্ণকালীন লেখালেখি শুরু করলাম, তখন আমার রুটিন ছিলো সকাল নয়টা থেকে বিকাল দুইটায় যে সময়ে আমার ছেলেরা বিদ্যালয় থেকে ফেরত আসতো ততক্ষণ পর্যন্ত কাজ করা। যেহেতু আমি কঠোর পরিশ্রমে অভ্যস্ত ছিলাম, সেহেতু শুধুমাত্র সকালে কাজ করায় আমার অপরাধবোধ হতো; তাই আমি বিকেলেও কাজ করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু আমি আবিষ্কার করলাম, বিকেলে আমি যা করছি তা আবার পরের দিন সকালে আমাকে পুনরায় করতে হচ্ছে। সুতরাং আমি সিদ্ধান্ত নিলাম শুধু নয়টা থেকে আড়াইটা পর্যন্তই আমি কাজ করবো, আর এই সময়ে অন্য কিছুই আর করবো না। বিকেলে আমি অনেকের সাথে দেখা করি, সাক্ষাৎকার দিই, আর অন্যান্য যেসব কাজ অতর্কিতে এসে হাজির হয় সেসব করি। আমার আরেকটা সমস্যা হলো আমি শুধুমাত্র পরিচিত পরিবেশে যেখানে আমি কাজ করায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি, সেখানে ছাড়া অন্য কোথাও লিখতে পারি না। আমি হোটেলে বা ভাড়া করা ঘরে কিংবা ভাড়া করা টাইপরাইটারে লিখতে পারি না। এটা বেশ ভালো একটা সমস্যা কারণ ভ্রমণ করার সময় আমি কিছু লিখতে পারি না। এটা ঠিক যে আপনি কম কাজ করার জন্য সবসময়ই কোন অজুহাত দাঁড় করাবেন। এই কারণে আপনি নিজের উপর যেসব শর্ত আরোপ করেন, তারা সবসময়ই খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। পরিস্থিতি যেমনই হোক, আপনি সর্বদাই তাই একটা অনুপ্রেরণার আশায় থাকবেন। এই শব্দটি (অনুপ্রেরণা) নিয়ে রোমান্টিকরা অনেক খেলেছেন। আমার মার্কসবাদী কমরেডদের পক্ষে এই শব্দটিকে মেনে নিতে অনেক সমস্যা হয়েছে, কিন্তু আপনি একে যে নামেই অভিহিত করুন না কেন, আমি নিশ্চিত যে এক ধরনের মানসিক অবস্থা আসলেই বিদ্যমান যে অবস্থায় থাকলে আপনি অনেক সহজে লিখতে পারেন আর আপনার লেখা তখন তরতর করে এগিয়ে যেতে থাকে। সব ধরনের অজুহাত- যেমন আপনি শুধু নিজের বাসায় থাকলেই লিখতে পারেন- এই সময়টায় অদৃশ্য হয়ে যায়। এই মুহূর্ত এবং এই ধরনের মানসিক অবস্থা তখনই আসে যখন আপনি সঠিক থিম এবং একে সঠিকভাবে ব্যবহার করার উপায় খুঁজে পান। আর এটাকে অবশ্যই হতে হবে এমন কিছু যা আপনি পছন্দ করেন, কারণ আপনি পছন্দ করেন না এরকম কিছু করার থেকে বাজে কাজ আর কিছু হতে পারে না। সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটা হচ্ছে প্রথম অনুচ্ছেদটি লেখা। আমি একটি প্রথম অনুচ্ছেদ লিখতে কয়েক মাস নিতে পারি, কিন্তু একবার এটি লিখে ফেলার পর বাকিটা খুব মসৃণভাবেই এগোতে থাকে। প্রথম অনুচ্ছেদেই আপনি আপনার বইটির বেশির ভাগ সমস্যার সমাধান করে ফেলেন। লেখাটির বিষয়, রচনাশৈলী আর সুর এইসব এই প্রথম অনুচ্ছেদটিতেই স্থির হয়ে যায়। অন্তত আমার ক্ষেত্রে প্রথম অনুচ্ছেদটি হচ্ছে বাকি বইটি কেমন হবে তার একটি নমুনার মতো। এই কারণে একটি উপন্যাস লেখার চেয়ে ছোটগল্পের একটি বই লেখা অনেক বেশি কঠিন। প্রতিবার ছোটগল্প লেখার সময় আপনাকে একেবারে প্রথম থেকে শুরু করতে হয়।

প্রশ্নঃ অনুপ্রেরণার উৎস হিশেবে স্বপ্নকে কি কখনো আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে?

মার্কেজঃ প্রথমদিকে আমি স্বপ্নদের প্রতি বেশ ভালো মনোযোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু পরে আমি এটা বুঝতে পারলাম, জীবন নিজেই অনুপ্রেরণার সবচেয়ে বড় উৎস আর স্বপ্নরা এই জীবন-স্রোতের কেবল ক্ষুদ্র একটি অংশ। আমার লেখা সম্পর্কে খুব সত্যি একটি ব্যাপার হচ্ছে স্বপ্নের বিভিন্ন ধারণা এবং তাদের ব্যাখ্যা নিয়ে আমি বেশ আগ্রহী। আমি স্বপ্নকে জীবনের একটা অংশ হিশেবেই দেখি, কিন্তু বাস্তবতা এর থেকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। অবশ্য এটাও হতে পারে যে আমার স্বপ্নরাই তেমন একটা সুবিধের নয়।

প্রশ্নঃ অনুপ্রেরণা আর স্বজ্ঞার মধ্যে কি আপনি পার্থক্য করতে পারেন?

মার্কেজঃ আপনার অনুপ্রাণিত হওয়ার মানে হলো আপনি আপনার লেখার জন্যে সঠিক বিষয়টিকে খুঁজে পেয়েছেন, যে বিষয়টিকে আপনি আসলেই অনেক পছন্দ করেন; অনুপ্রেরণা এভাবে আপনার কাজটিকে অনেক সহজ করে দেয়। অন্যদিকে, স্বজ্ঞা, যেটি কথাসাহিত্য লেখার আরেকটি মৌলিক উপাদান, সেটি হচ্ছে সেই বিশেষ গুণ যা আপনাকে কোন বৈজ্ঞানিক বা অন্য বিশেষ কোন জ্ঞান ছাড়াই বাস্তবতা কী তা খুঁজে পেতে সাহায্য করে। মহাকর্ষ সূত্র অন্য যেকোন কিছু অপেক্ষা স্বজ্ঞার সাহায্যে অনেক বেশি ভালো বুঝা যায়। এটা অনেকটা পরিশ্রম করা ছাড়াই কোন অভিজ্ঞতা লাভ করার মতো। ঔপন্যাসিকের স্বজ্ঞা থাকা অত্যন্ত জরুরী। মূলতঃ এটি বুদ্ধিবাদের সম্পূর্ণ বিপরীত, যেটাকে আমি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি- কারণ বুদ্ধিবাদ বাস্তব পৃথিবীকে একটি নিশ্চল তত্ত্বে পরিণত করে। স্বজ্ঞার একটি সুবিধা হচ্ছে এটি কোন একটি বিষয়কে হয় ঠিক অথবা ঠিক না এভাবে চিহ্নিত করে। একটি বর্গাকার গর্তে একটি গোলাকার পেরেক ঠুকতে যাওয়ার মতো অনাবশ্যক পরিশ্রম এখানে করার দরকার হয় না।

প্রশ্নঃ তার মানে কি আপনি তাত্ত্বিকদের অপছন্দ করেন?

মার্কেজঃ হ্যাঁ। এর প্রধান কারণ আমি তাদেরকে বুঝতে পারি না। এই কারণেই বেশির ভাগ ব্যাপার আমাকে কাহিনীর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে হয়; কোনকিছুকে বিমূর্তভাবে দেখার সামর্থ্য আমার একমদই নেই। এই কারণেই অনেক সমালোচকেরা আমাকে সংস্কৃত ব্যক্তি বলে মনে করেন না। তাদের মতে আমার কাজে যথেষ্ট উদ্ধৃতি থাকে না।

প্রশ্নঃ আপনি কি মনে করেন সমালোচকরা আপনাকে একটি নির্দিষ্ট লেখক শ্রেণীতে ফেলতে গিয়ে সংকীর্ণতার পরিচয় দেন?

মার্কেজঃ আমার কাছে সমালোচকরা বুদ্ধিবাদের প্রকৃষ্ট উদাহরণ । প্রথমত একজন লেখকের কীরকম হওয়া উচিত এটি সম্পর্কে তাদের একটি তত্ত্ব থাকে। এরপর সেই লেখককে তারা তাদের উদ্দিষ্ট তত্ত্বের দ্বারা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন, আর যদি কোনভাবেই সেই লেখক তাদের এই তত্ত্বের সাথে খাপ না খায়, তারপরও তারা তাকে জোর করে সেই তত্ত্বের সাথে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। আপনি প্রশ্ন করাতেই আমার এতকিছু বলা। সমালোচকরা আমার সম্পর্কে কী বললো এ সম্পর্কে আমার আসলেই কোন আগ্রহ নেই; অনেক বছর ধরে আমি সমালোচনা পড়িও না। তারা দাবি করেন লেখক এবং পাঠকের মধ্যস্থতাকারীদের কাজ তারাই করেন। আমি সবসময় চেষ্টা করেছি স্পষ্ট এবং যথাযথভাবে লিখতে, চেষ্টা করেছি সমালোচকের মাধ্যমে না গিয়ে সরাসরিভাবে পাঠকের কাছে পৌছাতে।

প্রশ্নঃ অনুবাদকদের সম্পর্কে আপনি কী বলবেন?

মার্কেজঃ পাদটীকা ব্যবহারকারীদের ছাড়া আর সব অনুবাদকদেরকেই আমি সপ্রশংস দৃষ্টিতে দেখি। পাদটীকা ব্যবহারকারীরা সর্বদাই এরকম কিছু ব্যাখ্যা পাঠকদের দিতে চেষ্টা করেন, যেটি সম্ভবত লেখকের উদ্দেশ্যই ছিলো না; কিন্তু যেহেতু পাদটীকা আছে, পাঠককে অবশ্যই এখানে অনুবাদকের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হয়। অনুবাদের কাজটি খুব কঠিন, যে কাজে পুরস্কৃত হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই আর যে কাজের পারিশ্রমিকও অত্যন্ত নগণ্য। একটি ভালো অনুবাদের মানে হচ্ছে অন্য ভাষায় নতুনভাবে কিছু সৃষ্টি করা। এই কারণে গ্রেগোরি রাবাসা’র প্রতি আমার মুগ্ধতা অনেক বেশি। আমার বইগুলি সব মিলিয়ে একুশটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে কিন্তু একমাত্র রাবাসাই একমাত্র অনুবাদক যিনি কখনো আমার কাছে কোনকিছুর ব্যাখ্যা জানতে চাননি যাতে তিনি ব্যাখ্যাটিকে তার পাদটীকায় রাখতে পারেন। আমি মনে করি তার করা অনুবাদের মাধ্যমে ইংরেজি ভাষায় আমার কাজকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। বইটির কিছু অংশ পুরোপুরি বুঝতে পারা বেশ কঠিন। যে কারও এরকম মনে হতে পারে যে অনুবাদক বইটি প্রথমে পড়েছেন এবং তারপর তিনি শুধুমাত্র তার স্মৃতির উপর নির্ভর করে এটিকে পুনরায় লিখেছেন। এই কারণে অনুবাদকদের প্রতি আমার এত বেশি মুগ্ধতা। তারা বৌদ্ধিক নন, বরং তারা স্বজ্ঞাবান। প্রকাশকরা তাদের কেবল কম পারিশ্রমিক দেন তাই নয়, তারা এমনকি অনুবাদকের কাজকে সাহিত্যিক সৃষ্টি হিশেবেও বিবেচনা করতে নারাজ। কিছু বই আছে যাদের আমি স্প্যানিশ-এ অনুবাদ করতে চাই, কিন্তু আমার নিজের বই লিখতে যত সময় দরকার এদের জন্য আমাকে ঠিক ততটুকু সময় দিতে হবে আর তা করতে গেলে আমি আসলে খেয়েপড়ে বাঁচতে পারবো না।

প্রশ্নঃ আপনি কোন বইগুলো অনুবাদ করতে পছন্দ করবেন?

মার্কেজঃ মারলোর সব লেখা। তাছাড়া আমি কনরাড আর স্যাঁ একজুপেরি অনুবাদ করতে চাইবো। যখন আমি কোন বই পড়ি, তখন মাঝে মাঝেই আমার মনে হয় আমি এই বইটি অনুবাদ করতে চাই। মহৎ এবং সেরা শিল্পকর্ম বাদ দিলে আমি মূল ভাষায় কিছু পড়ার চেয়ে মাঝারি মানের অনুবাদ পড়তেই বেশি পছন্দ করি। অন্য ভাষায় কিছু পড়তে আমার কখনোই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ হয় না কারণ একমাত্র স্প্যানিশ ভাষাতেই আমি কোনকিছুর ভেতরে ঢুকতে পারি। অবশ্য, আমি ইতালিয়ান আর ফরাসী বলতে পারি, আর আমি ইংরেজী ততটুকু ভালো জানি যতটুকু জানার কারণে বিশ বছর ধরে প্রতি সপ্তাহে আমি ‘টাইম’ সাময়িকী পড়ে আসতে পেরেছি।

প্রশ্নঃ আপনার কাছে এখন মেক্সিকোকে কি নিজের বাড়ির মতো মনে হয়? আপনি কি বৃহত্তর লেখক সম্প্রদায়ের একটি অংশ হিশেবে নিজেকে অনুভব করতে পারেন?

মার্কেজঃ সাধারণতঃ শুধুমাত্র সাহিত্যিক বা শিল্পী হওয়ার কারণেই কারও সাথে আমি বন্ধুত্ব করি না। বিভিন্ন পেশার মানুষের সাথে আমার বন্ধুত্ব রয়েছে, তাদের মধ্যে লেখক আর শিল্পীরাও আছেন। সাধারণ অর্থে, আমি শুধুমাত্র ল্যাটিন আমেরিকার যেকোন দেশে নিজেকে স্থানীয় হিশেবে অনুভব করি। ল্যাটিন আমেরিকানরা মনে করেন স্পেনই হচ্ছে একমাত্র দেশ যেখানে আমাদের সাথে ভালো ব্যবহার করা হয়, কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে সেখানকার কেউ মনে করতে পারি না। ল্যাটিন আমেরিকার অভ্যন্তরে সীমান্ত বা সীমানার ধারণা সম্পর্কে আমি সজাগ থাকি না। এক দেশের সাথে আরেক দেশের ভিন্নতা সম্পর্কে আমি সচেতন, কিন্তু আমার মনে এবং হৃদয়ে এদের কোন পার্থক্য নেই। যেখানে আমি সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, সেটা হচ্ছে ক্যারিবিয়া, সেটা ফরাসী ডাচ বা ইংরেজ যেটাই হোক না কেন। এই ব্যাপারটা আমাকে সবসময়ই আমোদিত করতো যে যখন আমি ব্যারানকুইলাতে উড়োজাহাজে উঠতাম, তখন নীল জামা পড়া একজন কালো মহিলা আমার পাসপোর্টে স্টাম্প মারতো, আর যখন আমি ওই উড়োজাহাজ থেকে জ্যামাইকাতে অবতরণ করতাম, তখনও নীল জামা পড়া একজন কালো মহিলা আমার পাসপোর্টে স্টাম্প মারতো, কিন্তু এবার স্ট্যাম্পের ভাষা হতো ইংরেজী। ভাষাকে আমার এই ক্ষেত্রে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না। কিন্তু পৃথিবীর অন্য যেকোন জায়গায় আমার নিজেকে ভিনদেশী মনে হয়, যে অনুভূতির কারণে আমি এক ধরনের নিরাপত্তহীনতায় ভুগি। এটি একটি ব্যক্তিগত অনুভূতি, কিন্তু যখনই আমি ভ্রমণ করি এই অনুভূতি আমার সাথে থাক। আমার মধ্যে এক ধরনের সংখ্যালঘু চেতনার অস্তিত্ব আছে।

প্রশ্নঃ ল্যাটিন আমেরিকান লেখকদের কিছু সময়ের জন্য ইউরোপে থাকাকে কি আপনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?

মার্কেজঃ সম্ভবত বাইরে থেকে একটি পরিপ্রেক্ষিত লাভ করার জন্য এর দরকার হতে পারে। এখন আমি যে ছোটগল্পের বইটি লিখতে চাচ্ছি, সেটা ল্যাটিন আমেরিকানদের ইউরোপে যাওয়া নিয়ে। বিশ বছর ধরে আমি এটা নিয়ে ভাবছি। আপনি যদি এই ছোটগল্পদের নিয়ে একটি চূড়ান্ত উপসংহারে আসতে চান, তাহলে এটা হতে পারে এই যে ল্যাটিন আমেরিকানরা, বিশেষ করে মেক্সিকানরা, খুব কমই ইউরোপে যান, এবং অবশ্যই তারা সেখানে গিয়ে কখনো থেকে যান না। আমি ইউরোপে যত মেক্সিকানদের দেখেছি, তাদের সবাই পরের বুধবারেই আবার বাড়ি পথ ধরেছিলো।

প্রশ্নঃ ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্যের উপর কিউবান বিপ্লবের প্রভাব কেমন বলে আপনি মনে করেন?

মার্কেজঃ এখন পর্যন্ত এর প্রভাব নেতিবাচক। অনেক লেখক, যারা নিজেদের রাজনৈতিকভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ হিশেবে দেখতে পছন্দ করেন, তারা মনে করেন তারা এমন বিষয় নিয়ে গল্প লিখতে বাধ্য যে বিষয় নিয়ে তারা লিখতে চান না, কিন্তু চাওয়া উচিত। এটি এমন একটি হিসেবী সাহিত্যের জন্ম দেয় যার সাথে অভিজ্ঞতা বা স্বজ্ঞার কোন সম্পর্ক নেই। এটির প্রধান কারণ হলো ল্যাটিন আমেরিকায় কিউবার সাংস্কৃতিক প্রভাব প্রতিহত করার অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। খোদ কিউবাতেই এমন কোন প্রক্রিয়া এখনও শুরু হতে পারেনি যেখানে নতুন ধরনের সাহিত্য বা শিল্প সৃষ্টি হতে পারে। এরকমটি হওয়ার জন্যে অনেক সময় দরকার। ল্যাটিন আমেরিকায় কিউবার সাংস্কৃতিক গুরুত্ব এখানেই যে অনেক বছর ধরে ল্যাটিন আমেরিকায় যে ধরনের সাহিত্য প্রচলিত ছিলো তা প্রচার করার একটি সেতু হিশেবে কিউবা কাজ করেছে। এক ভাবে বলতে গেলে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্যের হঠাৎ বিশাল সাফল্যের মূল কারণ কিউবার বিপ্লব। ওই প্রজন্মের প্রত্যেক ল্যাটিন আমেরিকান লেখক বিশ বছর ধরে লেখালেখি করে গেছেন, কিন্তু ইউরোপিয়ান এবং আমেরিকান প্রকাশকরা তাদের ব্যাপারে কখনোই তেমন উৎসাহ দেখাননি। কিউবাতে বিপ্লব হওয়ার পর রাতারাতি কিউবা আর ল্যাটিন আমেরিকা নিয়ে একটি আগ্রহ তৈরি হয়ে গেলো। বিপ্লব পরিণত হয়ে গেলো ভোগের একটি সামগ্রীতে। ল্যাটিন আমেরিকা পরিণত হলো ফ্যাশনে। আবিষ্কার হলো, এমন অনেক ল্যাটিন আমেরিকান উপন্যাস আছে যা অনূদিত এবং অন্যান্য বৈশ্বিক সাহিত্যের সাথে একই কাতারে বিবেচিত হওয়ার মতো যথেষ্ট ভালো। কষ্টের ব্যাপার হলো, ল্যাটিন আমেরিকাতে সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদ এতটাই প্রোথিত হয়ে গেছে যে তাদের উপন্যাস যে উৎকৃষ্ট এটা ল্যাটিন আমেরিকানদের বুঝানো অসম্ভব, যতক্ষণ না বাইরের কেউ এসে এরকম কিছু বলছে।

প্রশ্নঃ এখনকার স্বল্প পরিচিত ল্যাটিন আমেরিকান লেখকদের মধ্যে আপনি কাদের পছন্দ করেন?

মার্কেজঃ এখন এরকম কেউ আছেন কি না সে ব্যাপারে আমি সন্দিহান। ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্যের আকস্মিক সাফল্যলাভের পরবর্তী সবচেয়ে বড় ভালো পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হচ্ছে এখন প্রকাশকরা সর্বদা সচেতন থাকেন যাতে কোন নতুন কোরতাজার হাতছাড়া না হয়ে যেতে পারে। দুর্ভাগ্যবশত অনেক তরুণ লেখকই এখন তাদের নিজেদের কাজ থেকে খ্যাতির প্রতি বেশি মনোযোগী। টুলুস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ফরাসী অধ্যাপক ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্য নিয়ে লেখালেখি করেন; অনেক তরুণ লেখক তার কাছে আর্জি করেছেন, তিনি যাতে আমার পরিবর্তে অন্যদেরকে নিয়ে বেশি লিখেন, কারণ আমার চেয়ে অন্য লেখকদের এখন বেশি প্রচার দরকার। কিন্তু তারা এটা ভুলে যায় যে, যখন আমি তাদের বয়েসী ছিলাম তখন সমালোচকরা আমার সম্পর্কে লিখেননি, তারা বরং লিখেছেন মিগুয়েল এঞ্জেল এস্টুরিয়াসকে নিয়ে। আমি বলতে চাচ্ছি, এই তরুণ লেখকরা নিজের লেখা নিয়ে কাজ না করে সমালোচকদের কাছে লিখে তাদের সময় নষ্ট করছেন। লেখার বিষয়বস্তু হওয়ার থেকে লেখালেখি চালিয়ে যাওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমার সাহিত্যিক জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার হলো চল্লিশ বছর হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি আমার কোন লেখার সম্মানী পাইনি, যদিও ততদিনে আমার পাঁচটি বই প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিলো।

প্রশ্নঃ আপনি কি মনে করেন কোন লেখকের জীবনে খ্যাতি বা সাফল্য দ্রুত চলে আসা লেখকের জন্য ক্ষতিকর?

মার্কেজঃ যেকোন বয়সেই এটা খারাপ। আমার খুব ভালো লাগতো যদি আমার বইগুলো আমার মৃত্যুর পর স্বীকৃতি পেতো, অন্তত পুঁজিবাদী দেশগুলোতে, যেখানে আপনাকে এক ধরনের পণ্যে রূপান্তরিত করে ফেলা হয়।

প্রশ্নঃ আপনার পছন্দের বাইরে আপনি আজকে কিছু পড়েছেন?

মার্কেজঃ আমি খুব বিচিত্র জিনিসপত্র পড়ি। আমি সেদিন পড়ছিলাম মোহাম্মদ আলীর স্মৃতিকথা। ব্রাম স্টোকার এর ‘ড্রাকুলা’ বেশ ভালো একটি বই; অনেক আগে সম্ভবত এই বই আমার পড়া হতো না কারণ তখন এটিকে আমার সময়ের অপচয় বলে মনে হতো। অবশ্য কারও উপর আমার আস্থা আছে এরকম কেউ আমাকে পরামর্শ না দিলে আমি কখনোই কোন বই পড়া শুরু করি না। কথাসাহিত্য এখন আর আমার পড়া হয় না। আমি প্রচুর স্মৃতিকথা আর দলিলপত্র পড়ি, দলিলপত্র যদি ভূয়ো হয় তাও পড়ি। আর আমি আমার প্রিয় বই আবার পড়ি। প্রিয় বই আবার পড়ার সুফল হচ্ছে আপনি যেকোন পৃষ্ঠা থেকে আপনার পছন্দের কোন অংশ সরাসরি পড়া শুরু করে দিতে পারেন। শুধু ‘সাহিত্য’ পড়ার পবিত্র ধারণাটি আমার মধ্যে আর নেই। আমি সবকিছুই পড়ি। পৃথিবীতে যা কিছু ঘটছে আমি তার সবকিছুই জানতে চাই। প্রতি সপ্তাহে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রকাশিত হওয়া সব গুরুত্বপূর্ণ ম্যাগাজিন আমার পড়া হয়। টেলিটাইপ এর মাধ্যমে পড়ার অভ্যেস যখন থেকে আমার শুরু, তখন থেকেই আমি সব সময় খবরের সন্ধানে থাকি। কিন্তু সব রকমের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্র পড়া শেষ করার পর আমার স্ত্রী আমাকে এমন সব খবর বলেন, যা আমার এমনিতে জানা হয় না। তিনি এই ধরনের খবর পড়েন রূপচর্চা কেন্দ্রে রাখা ম্যাগাজিনগুলোতে। এই কারণে আমি ফ্যাশন ম্যাগাজিন, নারীদের ম্যাগাজিন ও অন্যান্য গুজবকেন্দ্রিক ম্যাগাজিনগুলোও পড়ি। এভাবে এমন কিছু আমার জানা হয়. যেসব শুধু এই ধরনের ম্যাগাজিন পড়ার মাধ্যমেই জানা যায়। এই সবকিছু আমাকে খুব ব্যস্ত রাখে।

প্রশ্নঃ লেখকের জন্য খ্যাতিকে কেন আপনি খুব ধ্বংসাত্মক হিশেবে দেখেন?

মার্কেজঃ প্রধানতঃ এটি আপনার ব্যক্তিগত জীবনকে আক্রমণ করে বলে। আপনার বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো বা কাজের প্রচুর সময় এটি কেড়ে নেয়। এটি আপনাকে বাস্তব পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। একজন বিখ্যাত লেখক যিনি লেখালেখি অব্যাহত রাখতে চান, তাকে খ্যাতির হাত থেকে ক্রমাগত নিজেকে রক্ষা করে চলতে হয়। আমি এটি বারবার বলতে চাই না কারণ এটি হয়তো ঠিক অকৃত্রিম শোনাচ্ছে না; কিন্তু আমার বইগুলো আমার মৃত্যুপরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হলেই আমি বেশি সুখী হতাম, যে ক্ষেত্রে আমাকে এত খ্যাতি আর মহৎ লেখক হওয়ার অস্বস্তির মধ্য দিয়ে আর যেতে হতো না। আমার ক্ষেত্রে খ্যাতির একমাত্র সুফল হলো আমি এটাকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করতে পেরেছি। এই একটা ব্যাপার বাদ দিলে, মোটের ওপর ব্যাপারটি বেশ অস্বস্তিকর। এখানে সমস্যাটি হলো আপনি চব্বিশ ঘন্টার জন্যেই বিখ্যাত আর আপনি কখনো এটি বলতে পারেন না, “আচ্ছা, এখন থেকে আগামীকাল পর্যন্ত সময়টুকুতে আমি অ-বিখ্যাত থাকবো”, অথবা একটি বোতামে চাপ দিয়ে বলতে পারেন, “আমি এখানে বা এই সময়টায় অ-বিখ্যাত থাকবো।”

প্রশ্নঃ আপনি কি ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অভ সলিচিউড’ এর অসাধারণ সাফল্য আগে থেকে আঁচ করতে পেরেছিলেন?

মার্কেজঃ আমি এটা জানতাম যে এই বইটি আমার বন্ধুদের আমার আগের যেকোন বই থেকে বেশি সন্তুষ্ট করবে। কিন্তু যখন আমার স্প্যানিশ প্রকাশক আমাকে বললেন যে তিনি এই বইয়ের আট হাজার কপি ছাপাবেন, আমি তখন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, কারণ আমার আগের কোন বই সাতশো কপির বেশি বিক্রি হয়নি। আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম কেন আমরা আরেকটু আস্তেধীরে বইটি ছাপাচ্ছি না, কিন্তু তিনি বললেন তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত যে বইটি যথেষ্ট ভালো এবং আট হাজার কপির সবগুলোই মে থেকে ডিসেম্বরের মধ্যেই বিক্রি হয়ে যাবে। আসলে এই আট হাজার কপি বুয়েনস এয়ারস-এ এক সপ্তাহের মধ্যেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিলো।

প্রশ্নঃ কেন ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অভ সলিচিউড’ এত দ্রুত এরকম ব্যাপক খ্যাতি পেয়ে গিয়েছিলো বলে আপনার মনে হয়?

মার্কেজঃ আমার ন্যূনতম কোন ধারণা নেই, কারণ আমি আমার নিজের লেখার খুব বাজে সমালোচক। যে ব্যাখ্যাটা আমি বারবার শুনেছি তা হচ্ছে এটি নাকি ল্যাটিন আমেরিকার মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে লেখা একটি বই, যেটা লেখা হয়েছে একদম ভেতর থেকে। এই ব্যাখ্যাটা আমাকে অবাক করেছে কারণ আমি প্রথম যখন এটি লেখার চেষ্টা করি তখন আমি এই বইয়ের নাম ঠিক করেছিলাম ‘দ্য হাউজ’। আমি চেয়েছিলাম সম্পূর্ণ উপন্যাসটি বিকশিত হবে ঘরটির ভেতর, বাইরের যেকোন ঘটনা আসবে শুধুমাত্র ঘরটির উপর এর প্রভাবের উপর ভিত্তি করে। আমি পরে এই নামটি বাদ দিই, কিন্তু যখন বইটি শেষ পর্যন্ত মাকান্দো শহরে গিয়ে কেন্দ্রীভূত হয়, এরপর থেকে বইটি এই শহরটিকে আর অতিক্রম করেনি। আরেকটি ব্যাখ্যা আমি শুনেছি যে প্রত্যেক পাঠকই এই বইয়ের চরিত্রদেরকে তাদের নিজেদের পছন্দমাফিক তৈরী করে নিতে পারেন। আমি চাই না এই বইটি নিয়ে সিনেমা হোক, কারণ সিনেমার দর্শক হয়তো কোন চরিত্রের এমন একটি চেহারা দেখবেন যেরকম তিনি কল্পনা করেননি।

প্রশ্নঃ বইটিকে সিনেমায় রূপান্তরিত করার ব্যাপারে কেউ কি আগ্রহী ছিলো?

মার্কেজঃ হ্যাঁ, আমার এজেন্ট এই ধরনের প্রচেষ্টা নিরুৎসাহিত করার জন্য সিনেমায় বইটি বিকোবার দর এক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ঠিক করেছিলেন। উৎসাহীরা যখন এই দরের কাছাকাছি পৌছে যাচ্ছিলেন তখন তিনি তা বাড়িয়ে তিন মিলিয়নে নিয়ে গেলেন। কিন্তু আমার এই বইটিকে সিনেমায় রূপান্তরের কোন আগ্রহ নেই, আর যতক্ষণ আমি এটাকে বাধা দিয়ে যেতে পারবো, ততক্ষণ এটি হচ্ছেও না। আমি চাই পাঠক এবং বইটির মধ্যে একটা ব্যক্তিগত সম্পর্কের মতোই এটি থাকুক।

প্রশ্নঃ আপনি কি মনে করেন যেকোন বইকে সিনেমায় সফলভাবে অনূদিত করা যায়?

মার্কেজঃ আমার এরকম কোন সিনেমার কথা মনে পড়ছে না যেটি একটি ভালো উপন্যাসকে আরও সমৃদ্ধ করতে পেরেছে, কিন্তু খুব খারাপ উপন্যাস থেকে অনেক ভালো সিনেমা হয়েছে এরকম অনেক দৃষ্টান্ত আমার মনে আসছে।

প্রশ্নঃ আপনি নিজে সিনেমা বানানোর ব্যাপারে কখনো চিন্তা করেছেন?

মার্কেজঃ একটা সময় ছিলো যখন আমি সিনেমার পরিচালক হতে চেয়েছিলাম। আমি রোমে সিনেমা পরিচালনা নিয়ে পড়েছিলাম। তখন মনে হয়েছিলো, সিনেমা এমন একটি মাধ্যম যার কোন সীমাবদ্ধতা নেই এবং যেখানে যেকোন কিছুই করা সম্ভব। আমি মেক্সিকোতে এসেছিলাম সিনেমায় কাজ করার জন্যে, পরিচালক হিশেবে নয় বরং চিত্রনাট্য লেখার উদ্দেশ্যে। কিন্তু সিনেমার বিশাল একটি সীমাবদ্ধতা হচ্ছে এটি একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল শিল্প, একটি পূর্ণাঙ্গ ইন্ডাস্ট্রি। আপনি বাস্তবে যা বলতে চান তা সিনেমায় প্রকাশ করা খুব কঠিন একটি কাজ। এখনও সিনেমা নিয়ে আমি চিন্তা করি, কিন্তু এটিকে এখন আমার কাছে একটি বিলাসিতা মনে হয় যা আমি আমার বন্ধুদের সাথে একসঙ্গে করতে পছন্দ করবো নিজেকে প্রকাশ করার কোন আশা ছাড়াই। এভাবে আমি সিনেমা থেকে ক্রমাগত আরও দূরে সরে গেছি। সিনেমার সাথে আমার সম্পর্ক সেই প্রেমিকযুগলের মতো যারা আলাদা থাকতে পারে না, আবার একসাথেও যাদের থাকা সম্ভব না। ফিল্প কোম্পানি বা সাময়িকীর মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বললে অবশ্য আমি সাময়িকীকেই বেছে নেবো।

প্রশ্নঃ আপনি এখন কিউবা নিয়ে যে বইটি লিখছেন, সেটিকে আপনি কিভাবে বর্ণণা করবেন?

মার্কেজঃ আসলে বইটি অনেকটা একটি বড় সংবাদ প্রতিবেদনের মতো যেখানে কিউবাতে জীবনযাত্রার ধরন কেমন আর কিউবানরা কিভাবে এত অভাবের মধ্যেও বেঁচেবর্তে আছে এসবের চিত্র থাকবে। গত দুই বছরে কিউবাতে অনেক বার ভ্রমণের মধ্যে যে ব্যাপারটা আমাকে সবচেয়ে অভিভূত করেছে তা হলো সেখানকার আরোপিত অবরোধ সেখানে এক ধরনের ‘প্রয়োজনের সংস্কৃতি’ নির্মাণ করেছে, যে সামাজিক পরিস্থিতিতে লোকজনকে নির্দিষ্ট কিছু জিনিস ছাড়াই চালিয়ে নিতে হয়। যে দিকটা আমাকে মূলতঃ আগ্রহী করেছে তা হলো কিভাবে এই অবরোধ মানুষের মানসিকতা পরিবর্তনে অবদান রেখেছে। এখন আমরা পৃথিবীতে ভোগবাদ-বিরোধী সমাজ এবং তীব্র ভোগবাদ-মুখী সমাজের একটি সংঘাত দেখতে পাচ্ছি। একটি সহজ ও বেশ ছোট সংবাদ প্রতিবেদন হিশেবে শুরু করার পর বইটি এখন এমন একটি ধাপে আছে যেখানে এটি পরিণত হচ্ছে বেশ বড়ো এবং জটিল একটি বইতে। কিন্তু এতে কিছু যায় আসে না আসলে, কারণ আমার সব বইয়ের ক্ষেত্রেই এরকম হয়েছে। তাছাড়া, এই বইটি ঐতিহাসিক সাক্ষ্যসহ প্রমাণ করবে যে ক্যারিবীয় বাস্তবতা ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অভ সলিচিউড’-এ বিবৃত ঘটনাগুলোর চেয়ে কম আজগুবি নয়।

প্রশ্নঃ দীর্ঘ পরিসরে আপনার কি লেখক হিশেবে কোন উচ্চাকাঙ্খা বা অনুশোচনা আছে?

মার্কেজঃ আমি আপনাকে খ্যাতি সম্পর্কে যা বলেছিলাম, এক্ষেত্রেও তাই বলবো। আমাকে সেদিন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো নোবেল পুরস্কার সম্পর্কে আমি আগ্রহী কি না, কিন্তু আমি মনে করি নোবেল পাওয়া আমার জন্য হবে একটি চরম বিপর্যয়। আমি এই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা রাখি এটি ভাবতে আমার ভালোই লাগবে, কিন্তু পুরস্কারটি গ্রহণ করাটা হবে আতঙ্কের। এটি খ্যাতির সমস্যাটাকে আরও বেশি জটিল করে তুলবে। জীবনে একটি জিনিস নিয়েই আমি আফসোস করি আর তা হলো আমার কোন কন্যাসন্তান না থাকা।

প্রশ্নঃ আপনার হাতে কি এমন কোন কাজ আছে যা নিয়ে আপনি আলোচনা করতে পারেন?

মার্কেজঃ আমি পুরোপুরি নিশ্চিত যে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে মহৎ বইটি লিখতে যাচ্ছি, কিন্তু আমি জানি না বইটি কী নিয়ে হবে অথবা কখন আমি এটি লিখবো। যখন আমি এরকম কিছু বোধ করি- বেশ কিছুদিন ধরেই আমি যা অনুভব করছি- আমি তখন বেশ শান্ত থাকি, যাতে বইটি আমার আশপাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমি তাকে ধরে ফেলতে পারি।

(সার্বিক সহযোগিতাঃ আমার অনুপ্রেরণার উৎস, মিনার্ভা)

মূল সাক্ষাৎকার এখানে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s