প্রবন্ধঃ অস্তিত্বের প্রতিফলন

সময় যত সামনের দিকে এগোতে থাকে, মানুষের অভিজ্ঞতাও ক্রমপুঞ্জীভূত হয়ে একটা ব্যক্তিগত এবং সামগ্রিক বোধের রূপ নেয়। প্রায় অর্ধেক জীবন পার করে ফেলার পর যখন অলস কোন সময়ে অস্তিত্ব প্রাণ এবং মৃত্যু এসব অধিতাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে ভাবতে বসি, তখন দেখি জীবন নিয়ে আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায় এতকিছু এত জটিল আন্তঃসম্পর্কের মধ্যে মিলেমিশে আছে যে তাকে সহজে ভাষায়িত করা অত্যন্ত দুরূহ, প্রায় অসম্ভব।
এই আন্তঃসম্পর্কের ব্যাপারটাই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ আর একে বুঝতে পারা এবং ভাষায় প্রকাশ করতে পারাকেই জীবনের সবচেয়ে জটিল ধাঁধার সমাধান বলে আমি মনে করি; কেন তা একটু ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন অবশ্যই।
যখন অস্তিত্ব বা জীবনের সারবস্তু’র মত বিষয় নিয়ে চিন্তা করি, তখন আমি যেভাবেই এগোই না কেন একটা সময় পর কতকগুলো বিভিন্ন আপাত সম্পর্কহীন বিষয়ও চলে আসে। অস্তিত্ব প্রাথমিকভাবে অবশ্যই ব্যক্তিগত। আমার অস্তিত্ব আমার মধ্যেই এবং অস্তিত্ব সম্পর্কিত যেকোন চিন্তা অবশ্যই ‘আমি’ দিয়ে শুরু হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু যেহেতু কয়েক হাজার বছরের ক্রমবিবর্তনের ফলাফল মানুষের বর্তমান ‘সমাজ ভিত্তিক সভ্যতা’ মানুষকে সম্পূর্ণ পৃথক এবং নির্জন থাকার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, সেহেতু মানুষের ব্যক্তিগত অস্তিত্বের প্রশ্নেও একটা সময় সমাজ ও সভ্যতার অনুপ্রবেশ ঘটে। তাই নগরসভ্যতা থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে প্রান্তিক এবং প্রাচীন আমিয়াখুম এর নির্জন ঝরণাধারার মুখে বসে থাকার সময়েও আমেরিকা এবং ইউরোপে নব্য-নাৎসিবাদের উত্থান সম্পর্কিত ভাবনা অনামন্ত্রিত অতিথির মতো হঠাৎ এসে বাগড়া দিয়ে বসে। এই ভাবনা কোনভাবেই অব্যক্তিক বৃহত্তর মানবতাবোধ থেকে উৎসারিত না, বরং এর মধ্যেও থাকে তীব্র ব্যক্তিগত দেনাপাওনার হিসাবনিকাশ। যেহেতু উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশ গমনের ইচ্ছা রাখি, সেহেতু আমেরিকা-যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনবিরোধী ট্রাম্পের বিজয় ব্যক্তিগত অস্তিত্বের প্রশ্নে মারাত্মকভাবেই বিবেচ্য হয়ে ওঠে। আর তাই সভ্যতা থেকে দুইদিনের জন্য পালালেও মুক্তি পাওয়া যায় না অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত সবকিছুর নির্বিচার এবং সহসা আক্রমণে।
কিন্তু আমার ব্যক্তিগত অস্তিত্বের সাথে আপাত অব্যক্তিক যেসব বিষয় জড়িত, তাদের স্বরূপ-সন্ধান এবং তাদের জড়িত থাকার মাত্রা নিরূপণ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। কারণ এখানে পরিমাণবাচক কোন এককে সম্পর্কের স্বরূপ বা মাত্রা নিরূপণ অসম্ভব, বিশেষ করে আমরা যদি দর্শন বা শিল্পকলার মাধ্যমে এই প্রশ্নের সমাধান করতে চাই। দর্শনের সাথে শিল্পকলার একটা নিকটা সম্পর্ক হয়তো এই যে মানবসভ্যতার এই দুই জ্ঞানের শাখাতেই স্পেকুলেশানের সুযোগ যথেষ্ট। দার্শনিকরা যেমনি জীব-জগত-অস্তিত্ব-জ্ঞান এসবের প্রশ্নে যথেচ্ছ অনুমান-নির্ভর তত্ত্বের আশ্রয় নেন, তেমনি সাহিত্যিকরাও জীবনকে প্রতিফলিত করতে গিয়ে নির্বিচার অনুমান আর স্পেকুলেশানের উপর নির্ভর করেন। দার্শনিকদের অন্তত ‘যুক্তিবিদ্যা’ নামক মহাস্ত্র আছে, সাহিত্যিকদের তাও না থাকায় কোন সাহিত্যকেই নির্দ্বিধায় সত্যের প্রতিফলন বলার যৌক্তিক কোন ভিত্তি একদমই নেই।
প্রত্যেক মানুষ যদি তার হৃদয়ের কথা শোনে, তাহলে তার জীবনের ক্রমসঞ্চিত অভিজ্ঞতাকে একটা নির্দিষ্ট রূপে প্রকাশ করা অথবা তার অস্তিত্বকে নির্দিষ্ট কোন বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত করার তীব্র একটা বাসনাকে সে কখনোই অস্বীকার করতে পারে না। এই বাসনার পীড়ন আমাকে ক্রমাগত বাধ্য করে সাহিত্যের মাধ্যমে, আরও সহজভাবে বললে ভাষার মাধ্যমে, নিজের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার একটা দৃশ্যমান আকৃতি দিতে। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারি আমার অস্তিত্ব যতক্ষণ পর্যন্ত আমার অভিজ্ঞতার সাথে একটা বোঝাপড়ায় আসতে না পারছে (বোঝাপড়া বলতে এখানে বুঝাচ্ছি অভিজ্ঞতাকে ভাষায় প্রকাশ করা), ততক্ষণ পর্যন্ত এই অস্তিত্ব তার যাথার্থ্য খুঁজে পাবে না। কিন্তু এই অভিজ্ঞতাকে ভাষায় প্রকাশ করার জন্য প্রথম যে ধাপ, সে ধাপেই জীবনের অর্ধেক সময় পার হয়ে গেলোঃ অভিজ্ঞতার শেকড়- এর গভীরতা এবং ব্যাপ্তি- এখনও এতটা বিস্তৃত বলে মনে হয় না যে অস্তিত্বের অন্তর্গত সমস্ত বিষয়ের আন্তঃসম্পর্কের দিব্যজ্ঞান সম্পর্কে আমার যথেষ্ট ধারণা হয়েছে বলা যায়।
কথাসাহিত্যের মধ্যেই যেহেতু আমি আমার ব্যক্তিগত জীবন-অভিজ্ঞতার অনেকাংশকে ধরা যেতে পারে বলে মনে করি, সেহেতু এই মাধ্যমেই আমি আমার অভিজ্ঞতার সারাৎসার প্রকাশে ইচ্ছুক। আর যতক্ষণ না পর্যন্ত জীবন সম্পর্কে একটা সামগ্রিক বোধ অর্জন করা যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সার্থক কথাসাহিত্য সৃষ্টি করা অসম্ভব। এখন এই জীবন আর অস্তিত্বের অন্তর্গত বিষয়সমূহ ঠিক কীভাবে নিজেদের মধ্যে আন্তসম্পর্কিত- এই রহস্যের সমাধান না করা পর্যন্ত জীবন সম্পর্কে সামগ্রিক বোধ অর্জন করাও অসম্ভব। এই সমাধানের পথটি অবশ্যই প্রত্যেক কথাসাহিত্যিকের জন্য অদ্বিতীয়; আরও কৌতূহলোদ্দীপক সত্যি হচ্ছে একটি অদ্বিতীয় এবং অভূতপূর্ব সমাধান ছাড়া কোন কথাসাহিত্যকেই সার্থক কিংবা মহৎও বলা যায় না। পুতুলনাচের ইতিকথার যে পথ, খোয়াবনামার পথ তার থেকে অনেক ভিন্ন, এবং ভিন্ন বলেই এরা দুইই সফল। জীবন-অভিজ্ঞতালব্ধ যে সত্য, তার কোন নির্দিষ্ট রূপ নেই; সফল কথাসাহিত্যিক কেবলমাত্র নিজের মত করে একটি অদ্বিতীয় সত্য-ই সৃষ্টি করেন। মহৎ কথাসাহিত্যের নানাবিধ গুণ, কিন্তু সর্বাগ্রে তাকে অবশ্যই হতে হবে অদৃষ্টপূর্ব, অভূতপূর্ব, এবং অদ্বিতীয়।
আমার ব্যক্তিগত অস্তিত্ব এক অবিরত সংকটের মুখোমুখি ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে, যখন আমি আবিষ্কার করি আমার অস্তিত্বের সুতো সাহিত্য, আরও নির্দিষ্ট করলে কথাসাহিত্য,-এর সাথে প্রবলভাবে জড়িত। কোন নির্দিষ্ট মুহূর্তে অতর্কিতে এই বোধ আসেনি, বরং অনেকদিনের অনেক চিন্তা-ভাবনা, অনুপ্রেরণা, অভিজ্ঞতা- সবকিছু মিলেমিশে ব্যাখ্যাতীত কোন বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ায় আমাকে এ মুহূর্তে এনেছে। কিন্তু আধুনিক পুঁজিবাদী নগরসভ্যতা তার নানাবিধ চাহিদার পীড়নে আমার নির্জন ধ্যানে বরাবরই বাধা দিয়ে এসেছে, যে ধ্যান ব্যতীত অর্থবহ কিছু লেখা অসম্ভব। আবার যখনই আমি একটু সময় পেয়েছি সবকিছু ভেবে দেখার, তখনই ঠিক করেছি আমি লিখবো ঠিক সেসব নিয়েই যারা আমাকে ক্রমাগত পীড়ন করে এসেছে। কারণ সময় এবং স্থানের প্রতি বিশ্বস্ত না থেকে সফল কথাসাহিত্য সৃষ্টি অবাস্তব। এই সময়ে কথাসাহিত্য রচনার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক এখানেই যে কথাসাহিত্যিককে অনবরত নাগরিক সভ্যতার ঝড়ঝাপটা সহ্য করে দিনশেষে এই নাগরিক সভ্যতার দিকেই তাকে ফিরে তাকাতে হয়। কাফকার মধ্যে এই উভয়সংকটের সর্বোচ্চ পর্যায় দেখি। বিশ শতকের এক কেরানী সারাদিন পুঁজিবাদের চাহিদা মেটানোর পর সেই পুঁজিবাদকেই তার লেখার বিষয়বস্তু করেন এক ভাবলেশহীন আরশোলার আবেগ নিয়ে- আধুনিক কথাসাহিত্যের অন্যতম স্থপতির সময় এখনও আমাদের অতিক্রম করেনি বুঝতে পারি।

যাকে নিয়ে আমি লিখতে যাচ্ছি সেই যখন আমার লেখার বড় বাধা হয়ে ওঠে, তখন কিভাবে এই সংকটের সমাধান করা যায় তা আমার জানার অগম্য এখনও। সময় আর স্থানের সাথে একটা বোঝাপড়ায় আসার পর যখন এদেরকে নিয়েই লেখার মত নিশ্চিন্তি আর স্থৈর্য্য আমার আসবে, একমাত্র তখনই সম্ভব জীবন-জগত আর অস্তিত্বের সাথে জড়িত সকল কিছুর আন্তঃসম্পর্কের হদিস খুঁজে পাওয়া; অবশ্যই এই খুঁজে পাওয়া হবে একান্তই আমার ব্যক্তিগত উপায়ে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s