বাঙালী জাতীয়তাবাদের স্বরূপ; একটি বই আলোচনা

বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান, এর ক্রমবিকাশ এবং এ সম্পর্কে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের বিভিন্ন মন্তব্য সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা হয়ে যায় এই বইটা পড়ার পর। মার্কসবাদী হওয়ার কারণে লেখকের অনেক বিশ্লেষণ বা উপসংহারেই একটা বামপন্থী সুর পাওয়া যায়, কিন্তু লেখকের যৌক্তিক এবং নির্মোহ অবস্থানের কারণে অনেকক্ষেত্রেই তার সিদ্ধান্তের সাথে একমত পোষণ না করে উপায় থাকে না। উদাহরণস্বরূপ লেখকের একটি সিদ্ধান্তের কথা বলা যায়। তার মতে, ভারত একক জাতিভিত্তিক কোন দেশ নয়, বরং এখানে কমপক্ষে বিশটির অধিক জাতি বাস করে। এই জাতিসমূহের মধ্যে সাংস্কৃতিক পার্থক্য অনেকটা ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে পার্থক্যের মতই। এখানে উল্লেখ্য, একটি জাতির স্বাতন্ত্র্যের পেছনে, অথবা নির্দিষ্ট একগুচ্ছ মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবাদের ধারণা গড়ে ওঠার পেছনে, লেখকের মতে, ‘ভাষা’-ই সর্ব্বোচ্চ এবং/অথবা কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনা করে। তাই লেখক সিদ্ধান্তে পৌছান, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ঐতিহাসিকভাবে ধর্মভিত্তিক, জাতিভিত্তিক নয়। বর্তমান পাঠকেরও সিদ্ধান্ত এই।

মাঝখানে ধর্মকে জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হিশেবে ধরে নিয়ে অনেক জল ঘোলা করে আবার আমরা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাকেই মেনে নিয়েছি, কিন্তু এর মাঝে বাঙলা দুই ভাগ হয়ে গেছে। কেন ভাষার পরিবর্তে ধীরে ধীরে ধর্মই পরিণত হল জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে, আবার পরে কেনইবা ভাষাভিত্তিক একটা দেশ করতে হল, তার একটা বিশ্লেষণমূলক ইতিহাস পাই এই বই-তে। এখানে লেখক মূল কারণ হিশেবে চিহ্নিত করতে চান মধ্যবিত্ত স্বার্থকে। লেখকের মতে মধ্যবিত্তরা সবসময়-ই নিজেদের স্বার্থ দেখেছে। এ কারণেই একটা সময়ে তারা ধর্ম নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিবাদ লাগিয়েছে, আবার একই কারণে ভাষাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে তারা একটা নতুন দেশ এর পত্তন ঘটিয়েছে। ইংরেজ শাসনের শেষদিকে হিন্দু ও মুসলিম এই উভয় সম্প্রদায়ের মানুষেরাই নিজ স্বার্থের কথা ভেবেছেন, তাই তখন ধর্মকে কেন্দ্র করে বিচ্ছিন্নতা এবং পরবর্তীতে বিরোধ দেখা দিয়েছিল। পাকিস্তান হওয়ার পর যখন বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তরা আবার দেখল তারা নতুন দেশে আবারও সেই পুরোনো কায়দায় শোষণের স্বীকার হচ্ছে, তখন হঠাতই তাদের কাছে ধর্ম থেকে ভাষাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল এবং একটা সময় তারা পশ্চিম থেকে আলাদা হতে বাধ্য হল। এক্ষেত্রেও সিরাজুল এর উপসংহারকে মেনে নিতে হয়। প্রকৃতপক্ষে দুইবার এই ভূখন্ড স্বাধীন হলেও একটি বিশেষ শ্রেণী ছাড়া আপামর জনসাধারণের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন হতে দেখা যায়নি। গান্ধী, জিন্নাহ এরা যেমনিভাবে কখনোই নিজের শ্রেণীস্বার্থের বাইরে আসতে পারেননি, তেমনিভাবে শেখ মুজিবও নিজ শ্রেণীর স্বার্থই দেখেছেন। গান্ধী বা জিন্নাহরা পারতেন উপমহাদেশের রাজনীতিকে একটা ইহজাগতিক রূপ দিতে, কিন্তু তারা তা না করে বরং রাজনীতিকে ধর্মাশ্রয়ী করে তুলেছেন, যে আদিপাপের ফল এই উপমহাদেশের তিনটি দেশই এখনও ভোগ করে যাচ্ছে। পরবর্তীতে শেখ মুজিবও ব্যর্থ হয়েছেন একই জায়গায়।

লেখকের সাথে যে জায়গায় স্পষ্ট দ্বিমত পোষণ করতে হয় তা হচ্ছে লেখকের মতে স্বাধীনতা থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল মানুষের মুক্তি, এবং এই মুক্তি তার মতে একমাত্র সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমেই আসতে পারত। অবশ্যই স্বাধীনতা থেকে মুক্তি অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যাপক, কিন্তু মুক্তির মাধ্যম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কী না এ ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ থাকে। সমাজতন্ত্র ইতিমধ্যেই প্রায় সব দেশে ব্যর্থ হয়েছে, এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো একটা সময় কর্তৃত্ববাদী সরকারের জন্ম দেয়। পুঁজিবাদের সমস্যা আছে হাজারটা, সবচেয়ে বড় সমস্যা পুঁজিবাদ অমানবিক। মানুষের মধ্যে বৈষম্য জিইয়ে রাখতে পুঁজিবাদ অব্যর্থ হাতিয়ার হিশেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত মনে হয় না পুঁজিবাদ থেকে উন্নততর কোন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আমরা আবিষ্কার করতে পেরেছি। তাই পুঁজিবাদের ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে তাকে কিছুটা সমাজতান্ত্রিক বানানোর চেষ্টাই বর্তমান সময়ে অধিক যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়। কল্যাণবাদী রাষ্ট্রের ধারণা এরকম চিন্তারই ফসল।

এই আদর্শিক ভিন্নতা বাদ দিলে সিরাজুল এর প্রায় সিদ্ধান্তসমূহের সাথেই একমত হতে হয়েছে। ধারাবাহিক ইতিহাস বিশ্লেষণের পাশাপাশি ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে আমাদের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের ধর্ম, ভাষা, জাতীয়তাবাদ সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে লেখক সমাজ ও সময়ের উপর বুদ্ধিজীবীদের প্রভাব এবং একই সাথে বুদ্ধিজীবীদের উপর সমাজ ও সময়ের প্রভাব এই দুইটিকেই স্পষ্টভাবে দেখাতে পেরেছেন। দেখতে পাই ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উত্থানের পেছনে রাজনীতিবিদদের অপেক্ষা তখনকার কবি-সাহিত্যিকদের ভূমিকাও কম নয়। বিভিন্ন আঙ্গিক থেকে জাতীয়তাবাদের উপর আলো ফেলা হয়েছে এই বইতে। দেখা যাচ্ছে হয়ত বিবেকানন্দ একদম সাধারণ মানুষের কাতারে নিজেকে নিয়ে আসতে পারছেন, কিন্তু ঠিকই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী মানসিকতা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারছেন না, ফলশ্রুতিতে ইহজাগতিক থাকা সম্ভব হচ্ছে না তার পক্ষে। আবার ভারতীয় অপেক্ষা বাঙালী জাতীয়তাবাদকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বঙ্কিম কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি শুধু যে ধর্মনিরপেক্ষ থাকতে পারলেন না তাই নয়, হয়ে গেলেন সাম্প্রদায়িক, এবং ধর্ম নিয়ে বিভক্তিকে উৎসাহিত করলেন। এইভাবে সেই সময়ের রাজনীতিবিদ-কবি-সাহিত্যিক-বিদ্বৎজনদের মধ্যে কাওকেই প্রশ্নাতীতভাবে নির্দোষ বলা যায় না, শুধু একজন মূর্তিমান ব্যতিক্রম বাদে। তিনি রবীন্দ্রনাথ! বাঙালির শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক খুব সম্ভবত সব মিলিয়েই শ্রেষ্ঠ বাঙালি, কারণ আর কেউ যা দেখতে পায় না তিনি তাই দেখতে পেতেন, তাও স্পষ্ট! জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন আঙ্গিকে তার বক্তব্য এখনও অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। হয়ত যে দিব্যদৃষ্টি তাকে দিয়ে অমানবিক সব সাহিত্যে সৃষ্টি করিয়ে নিয়েছিল, সেই একই দিব্যদৃষ্টি দিয়ে তিনি চিরন্ততার সন্ধান পেয়ে যেতেন খুব সহজে আর অন্য সবার জন্য যা বলা অচিন্ত্যনীয়, তাই তিনি বলতে পারতেন অবলীলায়। এজন্যই গান্ধী যেখানে ধর্মের সাথে মিশিয়েছেন রাজনীতিকে, সেখানে রবীন্দ্রনাথ আগাগোড়াই ছিলেন ধর্ম আর রাষ্ট্রের পৃথকীকরণের পক্ষে।

বাঙালী জাতীয়তাবাদের একটি সংক্ষিপ্ত কালানুক্রমের মধ্যে ঘুরিয়ে নিয়ে আসে এই বই। বাড়তি হিশেবে এই বই আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় অনেক বিদ্বৎজন সম্পর্কে একটু বিকল্প চিন্তার যোগান দেয়।

(বাঙালীর জাতীয়তাবাদ; সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী)

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s