এক মুহুর্ত: প্রেম

যার কোন সংজ্ঞা নাই কিন্তু অনেক উদাহরণ আছে তাই আমার কাছে প্রেম। প্রেমকে এ যাবৎকাল অনেকেই সংজ্ঞায়িত করতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছেন, কিন্তু তাই বলে মানুষের প্রেমে পড়া কিংবা প্রেম করা থেমে নেই। বিজ্ঞানীরা অবশ্য প্রেমের পেছনে দায়ী হরমোন হিশেবে ডোপামিনকে চিহ্নিত করেছেন। সামনের দিনে কোন এক সময় আমরা প্রেমের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ সম্পূর্ণভাবে আবিষ্কার করতে সক্ষম হব সন্দেহ নেই, তবে প্রেমের শুধু বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণটাই তো সব না, প্রেম শত বছর ধরে মানুষের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-মনস্তাত্ত্বিক জগতকেও যে বিশাল প্রভাবিত করে এসেছে এসব বিশ্লেষণেরও দরকার আছে।

মজার ব্যাপার, সবকালেই একটা বিশাল গোষ্ঠী প্রেমকে বাধা দিয়ে এসেছে। প্রেমের উপর নানানরকম বিধিনিষেধ আরোপ করার চেষ্টা করা হয়েছে ধর্ম, সংস্কৃতি, সমাজ- এর ‘স্বার্থে’। প্রেমের মত অসাধারণ (এবং খুব সম্ভবত শ্রেষ্ঠ) একটা মানবীয় আবেগকে খুব জঘণ্য হিশেবে দেখানোর চেষ্টা করে এই গোষ্ঠী প্রেমকে সমাজ থেকে বাতিল করে দিতে চেয়েছে। কিন্তু তারা এটা বুঝতে পারেনি প্রেম বাতিল হয়ে গেলে পুরো মানবজাতিই বাতিল হয়ে যায়! অন্যসব প্রাণির থেকে মানুষের উৎকর্ষের একটা বড় কারণ প্রেম-এই সত্য এই গোষ্ঠী কখনোই বুঝে উঠতে পারেনি। এই গোষ্ঠীর কারণে পুরো মানবজাতি পিছিয়েছে হাজার বছর। এমনকি এখনও পৃথিবীর অনেক প্রান্তে প্রেমকে খুব গর্হিত অপরাধ হিশেবে দেখা হয়। আমি মনে করি একটা জাতির উৎকর্ষ নির্ভর করে সামগ্রিকভাবে সেই সমাজ প্রেমকে কিভাবে দেখছে সেটার উপর। যে সমাজ নরনারীর প্রেমের সম্পর্কে বাধানিষেধ আরোপ করে, সেই সমাজ, আমার মতে তীব্র প্রতিক্রিয়াশীল এবং প্রগতিবিরুদ্ধ।

অবশ্য সমাজের বাধানিষেধ প্রেমের অগ্রযাত্রাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি কোনদিন; তীব্র শাস্তির সম্ভাবনা জেনেও সব কালে মানুষ-মানুষী একে অপরের প্রেমে পড়েছে। প্রেমের শহীদের সংখ্যা মানুষের ইতিহাসে নেহায়েৎ কম নয়।

মানুষের ইতিহাস একইসাথে তীব্র লজ্জার এবং অপার সম্ভাবনার; লজ্জার, কারণ প্রেমের মত অসাধারণ আবেগ বোধ করার জন্য অসংখ্য মানুষকে সহ্য করতে হয়েছে সীমাহীন দুর্ভোগ, অনেকক্ষেত্রে বরণ করতে হয়েছে মৃত্যু; সম্ভাবনার, কারণ এই সীমাহীন দুর্ভোগ আছে জেনেও মানুষ প্রেম করেছে, প্রেম করে যাচ্ছে।

যতদিন মানুষ বাঁচবে ততদিন তাকে প্রেমকে নিয়েই বাঁচতে হবে। যেদিন মানুষের হৃদয়ে, বলা ভালো, মস্তিষ্কে, প্রেম বলে কিছু থাকবে না, সেদিন এই মহাবিশ্বের শেষ মানুষটারও মৃত্যু হবে।

প্রেম তাই মানুষের নিশ্চিহ্ন হওয়ার আগের আশার সর্বশেষ বিন্দু।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s