খোয়াব দেখার কাল

১. চিলেকোঠার সেপাই পড়ে ক’টা দিন বিরতি দিয়েই আবার পড়া হল খোয়াবনামা। টানা ইলিয়াসের মধ্যে ডুবে থাকায় জাদুবাস্তবময় দু’টা মাস কাটানো গেল। অনেক সমালোচকের মতানুযায়ী খোয়াবনামাই ইলিয়াসের সেরা কর্ম, তবে আমি এই দুইটা উপন্যাসের কোন একটাকে অন্যটার চেয়ে এগিয়ে রাখতে পারছি না। দুইটাই আমাকে প্রচুর ভালো লাগার অনুভূতি দিয়েছে; আর লেখকের লেখার অসাধারণত্ব দুই উপন্যাসেই আমি সমানভাবে পেয়েছি, আর সমানভাবেই বিস্মিত হয়েছি।

খোয়াবনামা পড়তে গিয়ে চিলেকোঠার সেপাই এর সাথে এর সাদৃশ্যগত ব্যাপারগুলো অনিবার্যরূপেই এসে পড়ে। যেমন দুই উপন্যাসেরই পটভূমি উপমহাদেশের ইতিহাসের একটি বিশেষ ঘটনা। চিলেকোঠার সেপাইয়ের ক্ষেত্রে এই ঘটনাটা ছিল ঊনসত্তরের গণঅভূত্থান, আর খোয়াবনামার ক্ষেত্রে এই ঘটনাটা যদিও প্রধানতঃ দেশবিভাগের পূর্ববর্তী পাকিস্তান আন্দোলন, তারপরও এর ডালপালা একশ বছর আগের ফকির আন্দোলন পর্যন্ত বিস্তৃত। এদিক দিয়ে চিন্তা করলে খোয়াবনামায় কালের বিস্তৃতি চিলেকোঠার সেপাইয়ের চেয়ে দীর্ঘতর। উপন্যাসের কলেবরও কিছুটা বেশি খোয়াবনামায়, সেই সাথে উপন্যাসের চরিত্রের সংখ্যাও বেশি। আবার চিলেকোঠার সেপাইয়ের সাথে খোয়াবনামার লেখার ধরণের মিল বেশ স্পষ্ট। জাদুবাস্তবতার নমুনা দুইটা উপন্যাসেই প্রচুর পাওয়া যায়। বাস্তবতার সাথে কল্পনা অথবা অতিবাস্তবতার সংঘর্ষ ইলিয়াস খুব চমৎকারভাবেই পরিবেশন করেছেন তার দুইটা উপন্যাসেই। এই অতিবাস্তব অথবা জাদুবাস্তব অনুভূতির সাথে আমি বেশ ভালোই পরিচিত হয়ে উঠেছিলাম চিলেকোঠর সেপাই পড়ে, খোয়াবনামার পর এই অনুভূতির সাথে আমার একরকম আত্মীয়তার বন্ধন হয়ে গেল যেন।

বর্তমান লেখাটা যেহেতু খোয়াবনামা নিয়েই, সেহেতু চিলেকোঠার সেপাইয়ের সাথে খোয়াবনামার সমান্তরাল আলোচনার ইতি এখানেই টেনে বরং চলে যাই খোয়াব দেখার কালে।

২. খোয়াবনামার প্রেক্ষাপট মূলতঃ দেশভাগ পূর্ববর্তী পাকিস্তান আন্দোলন। বাঙলার শিক্ষিত মুসলমান তরুণদের একটা বিশাল অংশ তখন পাকিস্তান আন্দোলন দ্বারা তাড়িত হয়েছিল এই ঐতিহাসিক সত্যটা যেমনি এসেছে, তেমনি এসেছে গ্রামের বঞ্চিত মানুষের তেভাগা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার সত্যটাও। গ্রামের সাধারণ চাষা-জেলে-কলুরা রাজনীতি নিয়ে তেমন একটা সচেতন কখনোই ছিল না; তাদের মধ্যে যারা পাকিস্তান আন্দোলন সমর্থন করেছে তাদের সমর্থন করার প্রধান কারণ ছিল তারা মনে করেছিল পাকিস্তান হলে জমিদার আর জোতদারদের অত্যাচার কমে যাবে। ধর্মানুভূতি তাদের অতটা না ছিল। মূলতঃ তাদের ধর্মানুভূতিকে অনেক বেশি উসকে দেওয়ার পেছনে দায়ী ছিল পাকিস্তান আন্দোলনে যারা সরাসরি জড়িত ছিল তারা অর্থাৎ মুসলিম লীগের নেতাকর্মীরা। ওইদিকে কংগ্রেসী হিন্দুদের গোঁড়ামিও তৎকালীন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পেছনে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে। পাকিস্তান আন্দোলনের পাশাপাশি একশো বছরের পুরোনো ফকির আন্দোলনের কথাও উঠে এসেছে এই বিশাল কলেবরের উপন্যাসে।

ইলিয়াসের অসাধারণ কল্পনাশক্তির একটা পরিচয় আমরা পাই ফকির আন্দোলনের উল্লেখের মধ্যে মিথের অজস্র ব্যবহারে। ইলিয়াস ইতিহাসের প্রতি বিশ্বস্ত থাকেন ঠিকই, তবে গ্রামের সাধারণ মানুষের কুসংস্কারচ্ছন্ন দৃষ্টিও তার মধ্যে আছে। উপন্যাস তো শেষ বিচারে ইতিহাস নয়, বরং মানুষের জীবনালেখ্য। তাই যখন গ্রামের সাধারণ মানুষ উপন্যাসের চরিত্র হয়ে উঠে তখন সেই সাধারণ মানুষের উপলব্ধি ঔপন্যাসিককেও লাভ করতে হয়, তা না করতে পারলে উপন্যাস কিছুতেই সার্থক হয়ে ওঠে না। ইলিয়াস এই উপলব্ধি অনেকখানিই লাভ করতে পারেন, তাইতো খোয়াবনামার যেকোন সচেতন পাঠকও তমিজের বাপ আর বৈকুন্ঠ হয়ে ওঠে নিমিষে!

এই উপন্যাসের চরিত্রে সংখ্যা অসংখ্য। অনেক বেশি চরিত্র থাকলে প্রত্যেকটা চরিত্রের মধ্যে আলাদা একটা ব্যক্তিত্ব দেওয়ার কাজটাও খুব দুরূহ হয়ে ওঠে। কিন্তু খোয়াবনামায় প্রতিটা চরিত্রের বিশেষ একটা চারিত্রিক প্যাটার্ণ আমরা সহজেই আবিষ্কার করতে পারি। আবার কোন চরিত্রই পুরোপুরি ভালো বা মন্দ না হয়ে ভালোমন্দের মিশেলে বাস্তবসম্মত চরিত্র হয়ে ওঠায় আমরা আমাদের আশেপাশের মানুষের কিংবা নিজের সাথে অনেক চরিত্রের ব্যাপক সাদৃশ্যও দেখতে পাই।

৩. বেশ কয়েকটা চরিত্র আমাকে মুগ্ধ করলেও আমি খুব বেশি নাড়া খেয়েছি তমিজের বাপের কাছে। কুসংস্কারচ্ছন্ন এই মানুষটার রহস্যময় আচার-আচরণ আর হ্যালুসিনেশন আমাকে প্রায়ই চিলেকোঠার সেপাইয়ের ওসমানের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। ইলিয়াসের দুই উপন্যাসের মধ্যে অনেক পুনরুক্তি আছে যা কোন সচেতন পাঠকের দৃষ্টি এড়ানোর কথা নয়। দুই উপন্যাসের দুই প্রধান চরিত্রের মানসিক রোগী হওয়াটা যদিও পুনরুক্তিই বটে, তারপরও তাদের মনস্তত্ত্বে এবং হ্যালুসিনেশনের প্রকারে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য থাকায় পুনরুক্তিটা বিরক্তিকর হয়ে ওঠেনি কখনোই। তমিজের বাপের কাৎলাহার বিলের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় পাকুড়গাছের উপর কাল্পনিক মুনসীর আত্মাকে দেখার বিবরণে আমি তাই আবারও মুগ্ধ হলাম, যেরকম মুগ্ধ হয়েছিলাম চিলেকোঠার সেপাইয়ের ওসমানের একটা লাশের মধ্যে কয়েকটা লাশের অস্তিত্ব আবিষ্কারের মধ্যে।

তবে খোয়াবনামায় তমিজের বাপ প্রধান একটি চরিত্র হলেও এখানে কোন একক প্রধান চরিত্র না থাকায় পুরো উপন্যাসটা একটা মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি পেয়েছে। তমিজ, কুলসুম, কেরামত, ফুলজান, আবদুল কাদের, বৈকুন্ঠ, শরাফত মন্ডল, এমনকি ঐতিহাসিক চরিত্র বরকতুল্লা মুনসী- এরা সবাই এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্রের মধ্যেই পড়ে। আমি ভেবে কূল পাই না একজন লেখক কীভাবে এত চরিত্রের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করতে পারেন। আমি কূল পাই না, এজন্যই সাতপাঁচ চিন্তা না করে তমিজের বাপ কিংবা প্রান্তিক আরও অনেক মানুষের মত খোয়াব দেখা শুরূ করি।

খোয়াবের ব্যাখ্যা করা হয়না আমার। কারণ আমি জানি বিজ্ঞান এখনও খোয়াব দেখার কারণ কিংবা আমরা খোয়াবে কী দেখি তার বিশ্লেষণ করার মত পর্যায়ে যেতে পারে নাই। কিন্তু একজন ব্যক্তি ইলিয়াস ঠিকই আমাকে তমিজের বাপের মত বাধ্য করে খোয়াব দেখার পেছনে আকাশকুসুম কল্পনার ডালা সাজাতে বাধ্য করতে। আমি তমিজের বাপের পর্যায়ে হঠাতই নেমে যাই, অথবা উঠে যাই। আমি বুঝতে পারি তমিজের বাপের মনস্তত্ত্ব। আমি নিজেই তমিজের বাপ হয়ে উঠি।

এই যে আমাকে দিয়ে খোয়াব দেখিয়ে একটা ‘খোয়াবনামা’ দিয়ে এর ব্যাখ্যা করিয়ে নেওয়া, এই অসাধারণ কাজের জন্যই আমি ভালোবাসি সম্ভবত বাঙলা সাহিত্যের সেরা ঔপন্যাসিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s